ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জুলাই মাসে যা করে দেখিয়েছে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো বারবার চেষ্টা করেও তা পারেনি। একটি হাস্যরসাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে শুরু হওয়া ককরোচ আন্দোলনটি প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব এবং সরকারের উদাসীনতার বিরুদ্ধে তরুণদের এক দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
মাত্র দুই মাস বয়সী একটি দলের জন্য এই জয় বিশ্বজুড়ে অসাধারণ খ্যাতি এনে দেয়। একই সঙ্গে প্রত্যাশা তৈরি হয়- প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানের কুমারের পদত্যাগের দাবিতে অক্টোবর মাসের আন্দোলনেও তারা এই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে।
ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই সংশোধনের ফলে দলিত, সংখ্যালঘু, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা পাইয়ে দিতে পারে।
নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছে। তবে ককরোচ জনতা পার্টি দ্রুত জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুললেও, এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব তারা ধরে রাখতে পারেনি।
পরিবর্তে এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, অন্যান্য বিরোধী দল, প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বিরোধী দলের নেতারা মিছিল করেছেন, আটক হয়েছেন এবং ভোটের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নোটিশ ছাড়া নাম বাদ না দেওয়ার আইনি সুরক্ষার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
ককরোচ জনতা পার্টি এখনো দৃশ্যমান- বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে ও অনলাইনে- তবে যে রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যমণি তারা হতে চেয়েছিল, সেখান থেকে তাদের কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল সরকারের কঠোর দমনপীড়নের ফল নয়। এটি মূলত একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে কাজে লাগানোর পর, একটি স্থায়ী আন্দোলন টিকিয়ে রাখার সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও ফুটিয়ে তোলে।
এই আন্দোলনের প্রথম সীমাবদ্ধতা লুকিয়ে আছে এর দাবির প্রকৃতির মধ্যে। প্রশ্নপত্র ফাঁস সরাসরি শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিপ্রত্যাশীদের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। তারা বছরের পর বছর পড়াশোনা, পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থ ও আবেগ এমন একটি ব্যবস্থায় ঢেলে দিয়েছিলেন যা বারবার তাদের মেধার মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ককরোচ আন্দোলনটি তাদের মনের কথাই বলেছিল এবং তাদের অপমানকে সম্মিলিত ক্ষোভে রূপ দিয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিটি ছিল স্পষ্ট, বোধগম্য এবং লাখ লাখ ভারতীয় তরুণের দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে জড়িত।
কিন্তু ভোটার তালিকা নিয়ে কারসাজির বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে তরুণদেরও স্বার্থ রয়েছে, তবে এর মূল দাবিদার ও প্রাতিষ্ঠানিক খেলোয়াড় হলো রাজনৈতিক দলগুলোই। তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে থাকে ভোটার তালিকায় কাদের নাম থাকছে তার ওপর। তাছাড়া, নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রয়োজনীয় প্রমাণ, আইনজীবী, সংসদীয় প্ল্যাটফর্ম এবং দেশব্যাপী সাংগঠনিক নেটওয়ার্কও তাদেরই রয়েছে।
রাহুল গান্ধী অনেক দিন ধরেই ভোটার তালিকার অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। যখন দেশের বেশিরভাগ বিরোধী দল এক হয়ে যৌথ আন্দোলন শুরু করল, তখন একদম নতুন গড়ে ওঠা এই ককরোচ আন্দোলনটির পক্ষে সেই বিক্ষোভের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল না।
পাশাপাশি, ককরোচ জনতা পার্টি তাদের চমক দেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। এই আন্দোলনের শুরুটা ছিল নিতান্তই আকস্মিক। এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে যখন বেকার তরুণদের অপমান করে বলা ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) শব্দটিকে ইতিবাচক ও মজার ছলে ঐক্যের হাতিয়ার বানালেন, তখন সরকার এটিকে নিছক ইন্টারনেটের একটি তামাশা হিসেবে নিয়েছিল।
জুন মাসে দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে যোগ দিলে নড়েচড়ে বশে প্রশাসন, কারণ তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে কেনো ব্যাঙ্গচিত্র এভাবে টেকসই জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
সরকারের এই হিসাব-নিকাশের ভুলের সুযোগ নিয়েই আন্দোলনটি নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়, ছাত্র সংগঠনগুলোকে টানে এবং রাষ্ট্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই গতি পায়।
আন্দোলনের শুরুতে স্বতঃস্ফূর্ততা দারুণ কাজ করে। এটি সরকারকে বিভ্রান্ত করে এবং গতানুগতিক রাজনীতিতে বিরক্ত সাধারণ মানুষকে কাছে টানে। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততার আয়ু খুব দীর্ঘ হয় না। একবার প্রশাসন কৌশল বুঝে ফেললে সঠিক সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তবে অক্টোবরের মধ্যে সরকার ঠিকই বুঝে গিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি কতটা প্রভাবশালী হতে পারে। এবারে আন্দোলনের নেতারা নিজেদের কর্মসূচি আগেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করায়, প্রশাসন যাতায়াত আটকে দেওয়া ও সংগঠকদের দমনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যায়। ১০ অক্টোবর দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সাথে সাথেই ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ তিন নেতা দিপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়, ফলে তারা যন্তর মন্তরে পৌঁছাতেই পারেননি।
পুলিশ সম্ভাব্য বিক্ষোভের জায়গাগুলো সিলগালা করে দেয় এবং আন্দোলনের শুরুতেই অন্তত ৭ হাজার বিক্ষোভকারীসহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমায়েত হওয়া অনেককে আটক করে। সরকারের এই পদক্ষেপে তাদের ভেতরের ভীতি প্রকাশ পেলেও, জুলাইয়ের মতো পরিস্থিতি যে আর তৈরি হতে দেয়নি, তা কৌশলগতভাবে তাদের সফলতাই বটে।
এ ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে আন্দোলনটি এখনো নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিত্ব, অনলাইনে দেওয়া ঘোষণাে এবং একটি নির্দিষ্ট জায়গার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। সরকার যখন শীর্ষ নেতাদের আটকে দিল, তখন ককরোচ জনতা পার্টি আর শক্তিশালী কোনো বিকল্প বা স্বাধীন নেটওয়ার্ক সক্রিয় করতে পারেনি।
অন্যান্য দল বা সংগঠন প্রতিবাদ চালিয়ে গেলেও, ককরোচ জনতা পার্টির নিজস্ব দৃশ্যমানতা অনেকটাই কমে যায়।
এখান থেকেই তাদের তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটি প্রকাশ পায়- তা হলো একটি ‘কমিটি’ আর একটি পোক্ত ‘সংগঠন’-এর মধ্যকার ফারাক। জুলাইয়ের জয়ের পর দলটি একটি জাতীয় কমিটি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু একটি আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী রাজ্য ও জেলা ইউনিট, স্থানীয় সংগঠক, নিয়মতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতি, নিরাপদ যোগাযোগের মাধ্যম, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার পরিকল্পনা এবং প্রথম সারির নেতারা গ্রেপ্তার হলে হাল ধরার মতো দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব।
আন্দোলনের শুরুতে স্বতঃস্ফূর্ততা দারুণ কাজ করে। এটি সরকারকে বিভ্রান্ত করে এবং গতানুগতিক রাজনীতিতে বিরক্ত সাধারণ মানুষকে কাছে টানে। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততার আয়ু খুব দীর্ঘ হয় না। একবার প্রশাসন কৌশল বুঝে ফেললে সঠিক সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদি মাত্র তিনজন নেতার গ্রেপ্তারে পুরো দলের জনসমর্থন বা উপস্থিতি তলানিতে ঠেকে, তাহলে বুঝতে হবে সংগঠনের ভিত ব্যাপকভাবে ভঙ্গুর।
অন্যদিকে, সময়ের সাথে সাথে ককরোচ জনতা পার্টি ও প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্পর্কের সমীকরণও বদলে গেছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো যোগ দিয়েছিল কারণ শিক্ষা, বেকারত্ব ও প্রশ্নপত্র ফাঁস তাদেরও প্রধান ইস্যু ছিল, আর ককরোচ আন্দোলন জুগিয়েছিল নতুন তেজ ও স্লোগান। কিন্তু অক্টোবরে এসে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা), এআইএসএফ বা এসএফআই-এর মতো সংগঠনগুলোর কাছে বৃহত্তর বিরোধী জোটের সঙ্গে কাজ করার আকর্ষণ অনেক বেশি ছিল।
আইসা সভাপতি নেহা বোড়ার ভূমিকা দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ১০ অক্টোবর যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটকে দেয়, তখন বোড়া তাদের পুনরায় সংগঠিত করেন। এর দুদিন পরেই তিনি বিরোধী দলের কর্মসূচিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে মিছিলে পা মেলান।
আইসা সভাপতি নেহা বোড়ার ভূমিকা দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ১০ অক্টোবর যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটকে দেয়, তখন বোড়া তাদের পুনরায় সংগঠিত করেন। এর দুদিন পরেই তিনি বিরোধী দলের কর্মসূচিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে মিছিলে পা মেলান। এটি প্রমাণ করে- অভিজ্ঞ ছাত্রনেতারা সবসময় সেই প্ল্যাটফর্মটিকেই বেছে নেবেন, যা তাদের সবচেয়ে বড় পরিধি, আইনি সুরক্ষা এবং আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক সাফল্যে পৌঁছানোর পরিষ্কার রাস্তা দিতে পারবে।
এটি প্রমাণ করে- অভিজ্ঞ ছাত্রনেতারা সবসময় সেই প্ল্যাটফর্মটিকেই বেছে নেবেন, যা তাদের সবচেয়ে বড় পরিধি, আইনি সুরক্ষা এবং আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক সাফল্যে পৌঁছানোর পরিষ্কার রাস্তা দিতে পারবে।
বিশেষ এই ভোটার তালিকা সংশোধন বাতিলের দাবিতে রাহুল গান্ধী ও বিরোধীদের সঙ্গে টেক্কা দিতে গিয়ে ককরোচ জনতা পার্টি উল্টো আরো কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বুদ্ধিমানের কাজ হতো নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রেখেই জোটের সঙ্গে হাত মেলানো।
অন্যের সঙ্গে হাত মেলানোর অর্থ এই নয় যে নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে। ককরোচ জনতা পার্টি তরুণদের উজ্জীবিত করতে, ব্যঙ্গাত্মক প্রচার ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সাহায্য করতে পারে, আর বিরোধী দলগুলো আইনি লড়াই, সংসদে চাপ সৃষ্টি এবং দেশব্যাপী নেটওয়ার্কের জোগান দিতে পারে।
তাদের দীর্ঘমেয়াদি কাজ হওয়া উচিত একটি স্বাধীন চাপ সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা, যারা সরকারের ভুলত্রুটি নজরে আনবে এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও বাসস্থানের মতো দৈনন্দিন মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে তরুণদের এক জায়গায় নিয়ে আসবে।
এই ইস্যুগুলো ধরে কাজ করলে কোনো নির্দিষ্ট দলের তাঁবেদার না হয়েও তারা সবার সঙ্গে মিলে কাজ করতে পারবে। জুলাই মাস প্রমাণ করেছে যে- ককরোচ জনতা পার্টি আগুন জ্বালাতে জানে। কিন্তু অক্টোবরের শিক্ষা হলো- শুধু আগুন জ্বালালেই চলে না, তাকে টিকিয়েও রাখতে হয়।
আন্দোলন তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় যখন তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা বোঝে, জোট বাঁধতে জানে এবং মানুষের আবেগকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দেয়। ককরোচ আন্দোলন যদি এই শিক্ষাটা নিতে পারে, তাহলে বর্তমানের এই ধাক্কা বা পরাজয়ই হতে পারে তাদের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নাগরিক আন্দোলনের মূল ভিত্তি।
লেখক: অশোক সোয়াইন সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনিরুল হক ফিরোজ
