ভারতীয় কৃষিকে ‘বিকশিত ভারত’-এর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, পরিকাঠামো, বাজার ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং সর্বোপরি প্রতিটি কৃষি নীতিতে ভারতীয় কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া আমাদের কাজ। লিখছেন, শিবরাজ সিং চৌহান (কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ এবং গ্রামোন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী )।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণের পর, ভারতের উন্নয়ন কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে কৃষি ও কৃষক কল্যাণকে স্থান দেওয়া হয়। ২০১৫ সাল থেকে এই অঙ্গীকারটি একটি বৃহত্তর রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছে, যার লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি বা কৃষকের আয় বাড়ানোই নয়, বরং এমন একটি কৃষিক্ষেত্র গড়ে তোলা যা উৎপাদনশীল, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষম, প্রযুক্তি-চালিত এবং সুস্থায়ী। প্রধানমন্ত্রী বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, “একটি ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার জন্য ভারতীয় কৃষিরও উন্নয়ন প্রয়োজন।” আহ্বান জানিয়েছেন, ভারত যেন শুধুমাত্র নিজের খাদ্য চাহিদাই পূরণ না করে, বরং বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহকারী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশও করে। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’ এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর ‘জয় বিজ্ঞান’-এর ধারায় প্রধানমন্ত্রী যোগ করেছেন ‘জয় অনুসন্ধান’। এই স্লোগানের মাধ্যমে তিনি ভারতের কৃষি ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দুতে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে স্থাপন করেছেন। তাঁর এই কথাগুলি কেবল একটি নীতিগত দিকনির্দেশ ছিল না; বরং ছিল এক বাস্তবসম্মত দূরদর্শী চিন্তা, যার যথার্থতা ও প্রজ্ঞা এক দশক পরের তথ্যের ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
নব উত্তরণ
‘সবুজ বিপ্লব’ ভারতকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছিল। এই মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব– পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকের সমৃদ্ধি, সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা। ভারতের কৃষিযাত্রার ইতিহাস এক অসাধারণ সাফল্যের গল্প। এক সময় যে-দেশ খাদ্য আমদানির উপর নির্ভরশীল ছিল, কয়েক দশকের মধ্যেই ভারত প্রধান খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান, উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা, পরিকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ পরিষেবা এবং নীতিগত সহায়তার উপর ভিত্তি করেই এই সবুজ বিপ্লব সফল হয়েছিল। এটি প্রমাণ করেছে, যখন বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার কোনও জাতীয় লক্ষ্যের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কী অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তবে কৃষিক্ষেত্র অতীতের অগ্রাধিকারগুলির গণ্ডিতে আটকে থাকতে পারে না। আমাদের কৃষকদের আকাঙ্ক্ষা বদলেছে, নাগরিকদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে, বাজারের ধরন বদলেছে এবং এমনকী, জলবায়ুও পরিবর্তিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, “একটি ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার জন্য ভারতীয় কৃষিরও উন্নয়ন প্রয়োজন।”
কৃষিতে সামগ্রিক অগ্রগতি
২০১৫ সাল থেকে যে-রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৫-’৯৬ এবং ২০১৪-’১৫ সালকে ভারতীয় কৃষির বিবর্তনের ধারায় কাঠামোগত পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়, কারণ এগুলি ভারতীয় কৃষির বিকাশের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়কে নির্দেশ করে। প্রথম পর্যায়টি অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বাজারের বৃহত্তর সংহতি, ভোগ অভ্যাসের পরিবর্তন এবং শস্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলির ক্রমিক প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় পর্যায়টি অধিকতর বৈচিত্রময়, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উত্থানকে নির্দেশ করে– যা সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বাজার সংস্কার এবং সুস্থায়ী উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের উপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
১৯৬৭-১৯৯৫ পর্বে কৃষির অগ্রগতির হার ছিল গড়ে প্রায় ২.৭ শতাংশ এবং ১৯৯৬-২০১৪ সময়কালে তা ছিল প্রায় ৩.০ শতাংশ; ২০১৫-২০২৫ সময়কালে এই অগ্রগতির হার ত্বরান্বিত হয়ে প্রায় ৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছে (এর মধ্যে খাদ্যশস্য বার্ষিক ৮.৪ মিলিয়ন টন, বার্ষিক ফল ও শাকসবজি ৭.৬ মিলিয়ন টন এবং দুধ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে)। গত দু’বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে অসাধারণ অগ্রগতি দেখা গিয়েছে– প্রতি বছর ২২.১ মিলিয়ন টন হারে উৎপাদন বেড়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরগুলির তুলনায় অনেক বেশি। এই সাফল্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়, বিভিন্ন কর্মসূচির কার্যকর সুসংহতকরণ, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি গ্রহণ, সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ এবং কৃষকদের জন্য বর্ধিত সহায়তার সম্মিলিত ফল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই অগ্রগতি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে– এটি কেবল শস্য উৎপাদনের উপরই নির্ভরশীল নয়, বরং উদ্যানপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্যসম্পন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেও শক্তি অর্জন করছে। এই ধরনের কৃষি ব্যবস্থাই ভারতের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়কে গতিশীল করবে। আমাদের লক্ষ্য কেবল ‘আরও বেশি উৎপাদন’ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জল, জমি, শক্তি এবং অপ্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে আরও বেশি পরিমাণে উৎপাদন করতে হবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে উন্নত মানের, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন।
ভারতের ভোগ অভ্যাসের পরিবর্তন একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়। গ্রামীণ ভারতে ১৯৭২-’৭৩ সালে খাদ্য ব্যয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ ছিল শস্য বা দানা জাতীয় খাবারের পিছনে, ২০২২-’২৩ বর্ষ নাগাদ তা কমে প্রায় ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, ফল, শাকসবজি, ডিম, মাংস এবং মাছের পিছনে ব্যয়ের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলেও ভোগ অভ্যাসের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছে।
১৯৬৭-১৯৯৫ পর্বে কৃষির অগ্রগতির হার ছিল গড়ে প্রায় ২.৭ শতাংশ এবং ১৯৯৬-২০১৪ সময়কালে তা ছিল প্রায় ৩.০ শতাংশ; ২০১৫-২০২৫ সময়কালে এই অগ্রগতির হার ত্বরান্বিত হয়ে প্রায় ৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছে
আমাদের কৃষিক্ষেত্রকে এই নতুন ভারতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এর অর্থ– ডাল, তৈলবীজ, ফল, শাকসবজি, দুগ্ধজাত পণ্য, মৎস্য, পোল্ট্রি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যের উপর আরও বেশি গুরুত্ব আরোপ করা। এর অর্থ– খাদ্য নিরাপত্তার সংকীর্ণ ধারণা থেকে বেরিয়ে পুষ্টি নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর অর্থ– কৃষকদের এমন সব ‘ভ্যালু চেন’ বা মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া– যেখানে গ্রেডিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, লজিস্টিক্স এবং রফতানির ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।
কৃষককেন্দ্রিক কাঠামো
ভারত সরকার এই রূপান্তরের জন্য ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছে। ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা’ জলের দক্ষ ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। ‘সয়েল হেলথ কার্ড’ (মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড) উদ্যোগ মাটি পরীক্ষা এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাকে কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ‘পিএম-কুসুম’ প্রকল্প কৃষিকে নবীকরণযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত করছে। কৃষক উৎপাদক সংগঠনগুলি কৃষকদের পণ্য একত্রিত করার সক্ষমতা ও দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করছে। ‘ই-ন্যাম’ (e-NAM) কৃষি বাজারগুলিকে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত করছে।
অন্যদিকে ‘এগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড’, ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্পদা যোজনা’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রী ফর্মালাইজেশন অফ মাইক্রো ফুড প্রসেসিং এন্টারপ্রাইজ’ (PMFME) ফসল তোলার পরবর্তী পরিকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে। এই উদ্যোগগুলিকে এখন একটি একক কৃষককেন্দ্রিক মূল্য শৃঙ্খলে একত্র হতে হবে– বীজ থেকে মাটি, খামার থেকে বাজার এবং গবেষণাগার থেকে জীবিকা পর্যন্ত। এই রূপান্তরের মূলে থাকবে প্রযুক্তি। ভারতীয় কৃষি গবেষণা এখন কেবল ফসল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর প্রথাগত লক্ষ্যের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। ২০০৩ থেকে ’১৪ সালের মধ্যে যেখানে ১,৫৪০টি রকমের ফসলের জাত বাজারে এসেছিল, সেখানে ২০১৪ থেকে ’২৫ সালের মধ্যে ৩,২৩৬টি ফসলের জাত বাজারে এসেছে।
‘পিএম-কুসুম’ প্রকল্প কৃষিকে নবীকরণযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত করছে। কৃষক উৎপাদক সংগঠনগুলি কৃষকদের পণ্য একত্রিত করার সক্ষমতা ও দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করছে। ‘ই-ন্যাম’ (e-NAM) কৃষি বাজারগুলিকে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত করছে।
পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধকরণের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই পরবর্তী ‘কৃষি বিপ্লব’-কে হতে হবে নিখুঁত, সুস্থিতিশীল এবং জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি বিপ্লব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং, ড্রোন, জিনোমিক্স, জৈবপ্রযুক্তি, ডিজিটাল পরামর্শ ব্যবস্থা এবং ভূ-স্থানিক প্রযুক্তি কৃষকদের বীজ বপন, সেচ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় দমন, আবহাওয়া ও বাজার সংক্রান্ত বিষয়ে আরও ভাল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। ডিজিটাল কৃষি উদ্যোগ, ‘এগ্রিস্ট্যাক’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত পরামর্শমূলক প্ল্যাটফর্মগুলি কৃষি সেবাকে আরও সুনির্দিষ্ট ও সহজলভ্য করে তুলতে পারে। তবে প্রযুক্তি তখনই সুফল বয়ে আনবে, যখন তা কৃষকের কাছে সহজ, সাশ্রয়ী এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপে পৌঁছবে।
গবেষণাগার থেকে প্রান্তিক স্তর পর্যন্ত
এর ফলে গবেষণা ও সম্প্রসারণ পরিষেবার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে; অন্যদিকে, সম্প্রসারণ পরিষেবা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে খামারের বাস্তব উন্নতিতে পরিণত করে। আমাদের গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র, স্টার্টআপ, বেসরকারি উদ্ভাবক এবং কৃষকদের মধ্যে সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে, সম্পদের সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। ভারত অনির্দিষ্টকাল ধরে জল, সার, জ্বালানি ও জমির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষি উৎপাদন সম্প্রসারণ করতে পারবে না। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর হ্রাস, মাটির গুণমান নষ্ট হওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি একটি নতুন উৎপাদন পদ্ধতির দাবি রাখে। তথ্য-প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে, সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি অগ্রগতির ধারায় উচ্চ উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি অধিকতর স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছে।
আমাদের বিভিন্ন নীতিতে জল, পুষ্টি উপাদান এবং শক্তির প্রতিটি ইউনিটের যথাযথ ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে। গবেষণার ক্ষেত্রে জলবায়ু-সহনশীল জাত, জল ও পুষ্টি উপাদানের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিতকারী ফসল, মাটির উন্নত জৈবিক অবস্থা, সুসংহত কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণমূলক কৃষি এবং নিখুঁত কৃষি পদ্ধতির উপর অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। ডাল ও তৈলবীজ জাতীয় ফসলের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার, কারণ এগুলির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ভারতের পুষ্টিগত ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা জোরদার করার জন্য অপরিহার্য।
কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে; অন্যদিকে, সম্প্রসারণ পরিষেবা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে খামারের বাস্তব উন্নতিতে পরিণত করে।
দক্ষ বাজার, আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খল
একজন কৃষক যে-দক্ষতার সঙ্গে ফসল উৎপাদন করে, তাকে অবশ্যই তা লাভজনকভাবে বিক্রি করতে সক্ষম হতে হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিবাজার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেন, লজিস্টিক্স, পণ্যের মান নির্ধারণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশ ঘটা জরুরি। কৃষি উৎপাদনের প্রসার এবং পচনশীল পণ্যের চাষাবাদ বৃদ্ধির ফলে যথাযথভাবে পণ্য একত্রিত করা ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নতুন প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের সংগঠন, সমবায় সমিতি এবং কৃষক উৎপাদক সংস্থাগুলি লেনদেনের খরচ কমিয়ে, দর কষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং কৃষকদের সুসংগঠিত মূল্যশৃঙ্খলের অংশীদার করে তোলার মাধ্যমে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। ভারতকে এখন কেবল স্থানীয় মান্ডি বা বাজারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ববাজারের দিকে নজর দিতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এমন ভারতীয় কৃষি পণ্য তৈরি, যা বিশ্বস্বীকৃত মান, উৎস শনাক্তকরণ, নিরাপত্তা এবং ব্র্যান্ডিংয়ের দিক থেকে উন্নত। পরবর্তী ধাপে কৃষকদের কেবল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের সঙ্গেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ জোগাবে এবং কৃষি থেকে অর্জিত মূল্যের একটি বড় অংশ গ্রামীণ ভারতেই থেকে যেতে সাহায্য করবে। তবে এই পরিবর্তন শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এককভাবে আনা সম্ভব নয়। কৃষি একটি সম্মিলিত জাতীয় দায়িত্ব। রাজ্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষক উৎপাদক সংস্থা, সমবায় সমিতি, বেসরকারি উদ্যোগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজ, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য কৃষি, জল, জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুষ্টি, জলবায়ু, বাণিজ্য এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন।
এখানেই সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের কৃষি-পরিবেশগত বৈচিত্র এমন সব সমাধানের সঙ্গে যুক্ত, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় হলেও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে জাতীয়। ‘বিকশিত কৃষি’ থেকে ‘বিকশিত ভারত’-এর পথে যাত্রার সাফল্য কেবল কত টন ফসল উৎপাদিত হল, তার উপর নির্ভর করবে না, বরং তা পরিমাপ করা হবে আমাদের কৃষকদের জীবনযাত্রার মানের ভিত্তিতে। একজন সমৃদ্ধ কৃষকই সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি। একটি সুস্থিতিশীল কৃষি খামার হল, একটি শক্তিশালী খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। আর একটি প্রতিযোগিতামূলক কৃষি মূল্য শৃঙ্খল হল, বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতামূলক ভারতের ভিত্তি। তাই আমাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে– আমরা কতটা উৎপাদন করতে পারি? এবং তার পরিবর্তে মনোনিবেশ করতে হবে– আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে, সুস্থায়ী উপায়ে এবং লাভজনকভাবে উৎপাদন করতে পারি?
একজন কৃষক যে-দক্ষতার সঙ্গে ফসল উৎপাদন করে, তাকে অবশ্যই তা লাভজনকভাবে বিক্রি করতে সক্ষম হতে হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিবাজার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেন, লজিস্টিক্স, পণ্যের মান নির্ধারণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশ ঘটা জরুরি।
‘সবুজ বিপ্লব’ ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছিল। পরবর্তী কৃষি রূপান্তরকে ভারতের সমৃদ্ধি, পুষ্টি, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ দিয়েছেন: ভারতীয় কৃষিকে অবশ্যই ‘বিকশিত ভারত’-এর একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে হবে। আমাদের কাজ হল বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, পরিকাঠামো, বাজার ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং সর্বোপরি প্রতিটি কৃষি নীতিতে ভারতীয় কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে, কৃষক কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী হয়ে থাকবে না; বরং হবে ভারতের উন্নত ভবিষ্যতের রূপকার। ভারতের জন্য এখন প্রয়োজন এই ধরনের কৃষি রূপান্তর, আর এটিই হবে সেই ভিত্তি, যার উপর দাঁড়িয়ে থাকবে ২০৪৭ সালের ভারত।
