ভারতে চলমান আন্দোলনের মাঠে এখন পরিচিত মুখ নেহা বোরা। আপসহীন লড়াই আর সাহসিকতার নজির দেখিয়ে রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ার সেনশেসন হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা। তার মিছিল নিয়ে ব্যারিকেড টপকে এগিয়ে যাওয়া, পুলিশের গাড়িতে বন্দি হওয়ার পরেও ভেতর থেকে স্লোগান দেওয়া এবং সরাসরি পুলিশের মুখোমুখি লড়াইয়ে নামার দৃশ্যগুলো নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে।
সম্প্রতি বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন কমিশন অভিমুখী মার্চে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ঠিক পাশে হেঁটে মিছিলে নেতৃত্ব দেন নেহা। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন থেকে এসে মূলধারার জাতীয় রাজনৈতিক হেভিওয়েটদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নামায় রাজনীতির মাঠে তার গুরুত্ব ও প্রভাব অনেক বেড়ে গেছে।
নেহা বোরা উত্তরাখণ্ডের খাতিমার বাসিন্দা। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে পিএইচডি গবেষণা করছেন নেহা। পাশাপাশি বামপন্থী সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর জাতীয় সভাপতি পদে আছেন তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নেহা। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, স্নাতক স্তরে পড়ার সময় তিনি একটি নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে তিনি নিজের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনযাপন করা মানুষদের চরিত্রে অভিনয় করতে শেখেন, যা তাকে অন্যদের জীবনের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। নেহা বলেন, “আমার মনে হয়, এর শুরুটা অনেক আগে—যখন আমি স্নাতক পর্যায়ে পড়ছিলাম এবং একটি নাট্যদলে যোগ দিয়েছিলাম। আসলে, যখন আপনার শিক্ষা আপনাকে পরিপূর্ণতা দেয় না, তখন আপনি অন্য কোথাও সেই পূর্ণতার খোঁজ করেন। আমি তাই থিয়েটার শুরু করেছিলাম। কারণ সেখানে অনেক সৃজনশীল মানুষ ছিল। তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলত। পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করত এবং নিজেদের প্রকাশ করত—সব মিলিয়ে সেটি ছিল একটি সৃজনশীল পরিবেশ। তাই আমার মনে হয়েছিল, আমি সেখানে যেতে পারি।”
এই বিক্ষোভগুলোকে বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে আমরা যন্তর-মন্তরে যে আন্দোলন দেখছি—তা আসলে পর্দার আড়ালে তৈরি হচ্ছিল। ২০২৪ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষাতেও এ দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এই ক্ষোভ সহজে মুছে যায় না। মানুষ এই বঞ্চনা, প্রতারণা এবং নিরাশার অনুভূতিগুলো বয়ে বেড়ায়। আর যখনই আন্দোলনের সুযোগ আসে, মানুষ রাজপথে নেমে আসে। আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতিরোধ গড়ে তোলা সবসময়ই মানুষের আচরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
গত জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সময় সবার নজরে আসেন নেহা। সে সময় তিনি অন্যান্য আন্দোলনকারীর সঙ্গে যোগ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানান। যন্তর মন্তরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সরকার ও পুলিশের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন, যা অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে ভারতের পাশপাশি বাংলাদেশের তরুণদের মাঝেও ও বেশ পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশের সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্ট ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে একটি ভিডিও বার্তা পাঠান নেহা। যেখানে তিনি বাংলাদেশের তরুণদের “পথ দেখানোর” জন্য অভিনন্দন জানান এবং একাত্মতা প্রকাশ করেন। নেহা বলেন, ভারতের তরুণরাও গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষায় আন্দোলন করছে এবং বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা ও শিক্ষা নিচ্ছে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলনের দাবি হলো, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তথ্যের ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে—যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। যদিও ভারতের নির্বাচন কমিশন কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
