প্রথম আলো: মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আপনারা অনেক দিন ধরেই অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করছেন। কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর উচ্চ মূল্যের কারণে খরচ বেড়েছে। এই চ্যালেঞ্জ আপনারা কীভাবে মোকাবিলা করছেন?
শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম: মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন চাহিদা পূরণ করা আমাদের ব্যবসায়িক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বর্তমান সময়ে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, জমির উচ্চমূল্য এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে আবাসন নির্মাণের ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে একদিকে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রাখা, অন্যদিকে নির্মাণের গুণগত মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রকল্পের পরিকল্পনা, নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছি আমরা। তার জন্য কার্যকর নকশা তৈরি ও নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে দক্ষতা বাড়ানোয় জোর দিচ্ছি। একই সঙ্গে ক্রেতাদের চাহিদা ও সামর্থ্য বিবেচনায় রেখে ফ্ল্যাটের আয়তন ও বিন্যাস নির্ধারণ করছি।
প্রথম আলো: আমরা দেখছি, প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলো ১ কোটি টাকার নিচে ফ্ল্যাট দিতে পারছে না। তবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকায় দিতে পারছে। তারা পারলেও আপনারা পারছেন না কেন?
শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম: ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠানের আকার বা পরিচিতি বিবেচনা করলে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। প্রকল্পের অবস্থান, জমির মূল্য, ফ্ল্যাটের আয়তন, ভবনের নকশা, নির্মাণের মান এবং সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারিত হয়। তাই ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটের সঙ্গে আমাদের প্রকল্পের তুলনা করতে হলে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ছোট আয়তনের ফ্ল্যাট বা ভিন্ন অবস্থানের প্রকল্পে তুলনামূলক কম মূল্য নির্ধারণের সুযোগ থাকতে পারে।
আমরা মনে করি, ক্রেতাদের কাছে মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি স্বচ্ছ হওয়া উচিত। একটি ফ্ল্যাট কেনার সময় শুধু প্রাথমিক মূল্য নয়, নির্মাণের গুণগত মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা, ভবনের সুযোগ-সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতাও বিবেচনা করা জরুরি। আমাদের লক্ষ্য হলো ক্রেতাদের এমন একটি পণ্য দেওয়া, যা তাঁদের বর্তমান প্রয়োজনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদাও পূরণ করতে পারে। তবে মধ্যবিত্তের জন্য আরও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ প্রয়োজন, সেটি আমরা স্বীকার করি। এ জন্য ভবিষ্যতে প্রকল্পে জমির ব্যবহার ও নকশার কার্যকারিতা বাড়িয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ খুঁজতে চাই আমরা।
প্রথম আলো: ক্রেতারা এখন কোন ধরনের ফ্ল্যাটে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন?
শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম: বর্তমানে ক্রেতারা এমন ফ্ল্যাটের প্রতি বেশি আগ্রহী, যেখানে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গার সঠিক ব্যবহার, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, কার্যকর কক্ষবিন্যাস, পর্যাপ্ত পার্কিং, লিফট এবং শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী পরিবেশের বিষয়গুলো ক্রেতাদের বিবেচনায় থাকে। আমরা ক্রেতাদের এই পরিবর্তিত চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের নকশা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করি। আমাদের কাছে একটি আবাসন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শুধু ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিক্রি করা নয়; বরং এমন একটি বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একটি পরিবার দীর্ঘ মেয়াদে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে।
প্রথম আলো: আবাসন ব্যবসায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে মন্দা চলছে। এখানে গতি ফেরাতে কী ধরনের উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন?
শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম: আবাসন খাতের বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ খাতের সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহ, পরিবহন, প্রকৌশল, স্থাপত্য এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই আবাসন খাতের গতি ফিরিয়ে আনা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ক্রেতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী আবাসন ঋণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নির্মাণসামগ্রীর বাজারে মূল্য স্থিতিশীলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। নির্মাণ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হলে ফ্ল্যাটের মূল্যও ক্রেতাদের সামর্থ্যের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমে আসবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের আবাসন চাহিদা পূরণে শুধু শহরের ভেতরে নতুন প্রকল্প নির্মাণের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিকল্পিতভাবে শহরের সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো যায়। নতুন এলাকায় সড়ক, গণপরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে উন্নত ও সুন্দর নগর গড়ে তোলা সম্ভব। এতে আবাসন ব্যয় কমানোরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলো: আগামী বছরগুলোতে আপনারা কী ধরনের প্রকল্প করার পরিকল্পনা করছেন?
শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম: আগামী দুই থেকে তিন বছরে আমরা পরিকল্পিত ও আধুনিক আবাসন প্রকল্পের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই। এ ক্ষেত্রে কন্ডোমিনিয়াম বা কনডো-ধাঁচের প্রকল্প এবং ন্যূনতম ১০ কাঠা আয়তনের জমিতে উন্নয়নযোগ্য প্রকল্প আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। আমরা এমন প্রকল্প করতে আগ্রহী, যেখানে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, আধুনিক স্থাপত্য, নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং বসবাসের স্বাচ্ছন্দ্য একসঙ্গে নিশ্চিত করা যাবে।
ইঞ্জিনিয়ার শাহ মো. মাসুদ ইব্রাহিম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কমপ্রিহেনসিভ হোল্ডিংস
