আজকের পত্রিকা ডেস্ক

চার দশকের কর্মজীবনে হাজারো শিশুর প্রাণ বাঁচানো বিখ্যাত হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন আসিফ হাসান যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রাইড অব ব্রিটেন’ অ্যাওয়ার্ডে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট (আজীবন সম্মাননা) লাভ করেছেন। সম্প্রতি লন্ডনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে তাঁর হাত থেকে জীবন ফিরে পাওয়া ১৯ জন সাবেক রোগী উপস্থিত হয়ে তাঁকে এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত করেন।
যুক্তরাজ্যের ‘ডেইলি মিরর’ ও ‘পি অ্যান্ড ও ক্রুজেস’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসলের ফ্রিম্যান হাসপাতালের সাবেক এই শীর্ষ সার্জনকে তাঁর অসামান্য ও নিঃস্বার্থ সেবার জন্য সম্মানিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে আসিফ হাসানের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠা সাবেক রোগীরা একে একে মঞ্চে এসে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। রোগীদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী কিরা ওয়াইলি থেকে শুরু করে ৪৩ বছর বয়সী লরা মেসনের মতো নানা বয়সের মানুষ ছিলেন, যাঁদের অনেকেই এখন প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজেদের সন্তান রয়েছে।
কিরা ওয়াইলি গর্ভে থাকা অবস্থাতেই তাঁর হৃদ্যন্ত্রের ত্রুটি চিহ্নিত করেছিলেন আসিফ হাসান এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় তাঁর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
২৫ বছর আগে আসিফ হাসানের হাতে জীবন ফিরে পাওয়া নাটালি গ্রান্ট নামে এক রোগী অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘তখন আমি ভীষণ ভীত ছিলাম, কিন্তু এটুকু জানতাম যে আমি নিরাপদ হাতে আছি। আজ আমি দুই সন্তানের মা। আপনার অনুপ্রেরণাতেই আমি এখন শিশুদের হৃদ্রোগ বিভাগে কাজ করছি।’
অন্য এক তরুণ রোগীর বাবা-মা জানান, অস্ত্রোপচারের পর পুরো রাত বিছানার পাশে বসে থেকে শিশুটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এই চিকিৎসক।
পুরস্কার গ্রহণের সময় সাবেক রোগীদের দীর্ঘ সারি ও তাঁদের বার্তা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই চিকিৎসক। চোখের পানি মুছে তিনি বলেন, ‘এটি এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। ওদের প্রত্যেককে আবার একসঙ্গে দেখা আমার জন্য এক বিশাল মুহূর্ত।’
নিজের এই অসামান্য অর্জন নিয়ে বিনীত আসিফ হাসান বলেন, ‘আমি কেবল আমার দায়িত্ব পালন করেছি। নিজেকে একজন বাস চালকের মতো মনে হয়, যাঁর কাজ যাত্রীদের নিরাপদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়া।’
৩৭ বছরের দীর্ঘ সেবা ও প্রশিক্ষণ
১৯৮১ সালে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাজ্যে আসা আসিফ হাসান টানা ৩৬ বছর ফ্রিম্যান হাসপাতালে সেবা দিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি চারশটি সফল হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপন (হার্ট ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট) এবং তিন হাজারের বেশি জটিল হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া আরও এক হাজার অস্ত্রোপচারে সহকারী সার্জন হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব জটিল অস্ত্রোপচারের সময় তিনি টানা ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে দাঁড়িয়ে কাজ করতেন। অস্ত্রোপচারে যেন কোনো বিলম্ব না হয়, সে জন্য কাজের আগে খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত এড়িয়ে চলতেন বলে জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা।
রোগীদের জরুরি সেবার ডাকে তিনি ব্যক্তিগত জীবনকেও সব সময় দ্বিতীয় স্থানে রেখেছেন। তাঁর স্ত্রী ন্যান্সি ও কন্যা সাবিন জানান, কোনো দাতা অঙ্গ পাওয়ার খবর আসামাত্রই দিন-রাত বিবেচনা না করে তিনি হাসপাতালে ছুটে যেতেন। অনেক সময় টানা ৩৬ ঘণ্টার আগে তিনি বাড়ি ফিরতেন না।
ফ্রিম্যান হাসপাতালের বর্তমান সার্জন লুইস কেনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য এবং বিদেশের প্রায় প্রতিটি শিশু হৃদ্রোগ সার্জনকে গড়ে তোলার পেছনে আসিফ হাসানের অবদান রয়েছে। তিনি আমাদের কঠোর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যাতে প্রতিটি শিশুকে জীবনের সুযোগ দেওয়া যায়।’
অবসরজীবন ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
অবসর গ্রহণের পরও থেমে নেই আসিফ হাসান। তিনি এখন যুক্তরাজ্য ছাড়াও পাকিস্তান ও নাইরোবির মতো দেশে দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে তরুণ সার্জনদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যাতে তারা এই জীবন রক্ষাকারী কাজ এগিয়ে নিতে পারেন।
ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস)-এর ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘এনএইচএস একটি দুর্দান্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে একজন মানুষ বিনা মূল্যে হাত-পায়ের নখ কাটার সেবা যেমন পান, তেমনি বিনা মূল্যে হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের সুবিধাও পান।’

