ডিমকে বলা হয় পুষ্টির ‘পাওয়ারহাউস’। সহজে মেলে বলে প্রোটিন, ভিটামিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের চাহিদা মেটাতে ডিমের জুড়ি নেই।
তবে ডিমের কুসুমে থাকা উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কার শেষ নেই। অনেকেই ভাবেন, প্রতিদিন ডিম খেলে বুঝি রক্তের কোলেস্টেরল বেড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। আসলেই কি তাই?
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য গবেষক মার্ভে চেলান বলেন, “অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন ডিম খাওয়া কেবল নিরাপদই নয়, বরং বেশ উপকারী।”
প্রতিদিন ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?
একটি বড় ডিমে সাধারণত ১৮০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। এক সময় চিকিৎসকেরা দিনে ৩০০ মিলিগ্রামের কম কোলেস্টেরল গ্রহণ এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ তিনটি ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিতেন।
তবে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান ও খাদ্য নির্দেশিকায় এই ধারণা বদলে দিয়েছে।
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডিমের কুসুমে যে ‘ডায়েটারি কোলেস্টেরল’ থাকে, তা রক্তে ‘এলডিএল’ বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-এর মাত্রার ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলে না।
‘আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন’ এখন হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে দৈনিক খাদ্যতালিকায় ১ থেকে ২টি ডিম রাখার জোরালো সুপারিশ করছে।
এই প্রতিষ্ঠানে সাময়িকী ‘সার্কুলেইশন’-এ প্রকাশিত এক পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, সপ্তাহে ১ থেকে ৬টি ডিম খাওয়া হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি উল্টো কমিয়ে দিতে পারে।
ডিমে কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে?
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ-এর তথ্য অনুযায়ী, ৫০ গ্রামের একটি গোটা ডিমে প্রায় ৭১.৫ ক্যালোরি এবং ৬.৩ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। এছাড়া এতে মেলে সেলেনিয়াম, কোলিন, ফোলেইট, আয়রন, ভিটামিন ‘বি১২’, ‘এ’, ‘ডি’, ‘ই’ এবং ‘কে’।
পাশাপাশি ডিমের কুসুমে ‘লুটেইন’ ও ‘জিক্সাথিন’ নামক শক্তিশালী দুটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে।
শুধু ডিমের সাদা অংশ খাওয়া হলে কোলেস্টেরল ও চর্বি ছাড়াই ৩.৬ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া সম্ভব। তবে কুসুম বাদ দিলে ডিমের প্রধান পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিনগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
আসল শত্রু কোলেস্টেরল নয়, স্যাচুরেটেড ফ্যাট!
বিজ্ঞানীরা বলছেন, খাবারের কোলেস্টেরলের চেয়ে খাবারে থাকা ‘স্যাচুরেইটেড ফ্যাট’ বা সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে কোলেস্টেরল বাড়াতে বেশি ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্যাচুরেইটেড ফ্যাট গ্রহণ করলে হৃদরোগের ঝুঁকি সরাসরি বাড়িয়ে দেয়।
একটি ডিমে মাত্র ১.৫ গ্রাম স্যাচুরেইটেড ফ্যাট থাকে, যা খুবই সামান্য। বরং সমপরিমাণ চর্বিযুক্ত গরুর মাংসে এই ক্ষতিকর চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি (প্রায় ৫.৩ গ্রাম) থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ নিক্কি ফাতা বলেন, “প্রতিদিন ডিম খাওয়ার একমাত্র সম্ভাব্য সমস্যা হতে পারে যদি এটি খাবারের বৈচিত্র্য কমিয়ে দেয়। শরীরে সব পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে ডিমের পাশাপাশি অন্যান্য খাবারও খাওয়া উচিত।”
ডিম রান্নার পদ্ধতি কি প্রভাব ফেলে?
ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, তার ওপর এর ক্যালোরি ও চর্বির পরিমাণ নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেটাবলিক হেলথ’ বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ ক্রিস্টেন লোরেঞ্জের মতে, “সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন ডিম খাওয়ায় কোনও ঝুঁকি নেই। আসল ঝুঁকি লুকিয়ে আছে ডিমের সঙ্গে কী খাচ্ছি তার ওপর। যেমন মাখন, চিজ বা প্রক্রিয়াজাত মাংস (সসেজ)।”
ভাজা বা স্ক্র্যাম্বলড ডিম: মাখন বা ডালডা দিয়ে ডিম ভাজলে বা স্ক্র্যাম্বল করলে তাতে স্যাচুরেইটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়। মাত্র এক চা-চামচ মাখন যোগ করলেই, ডিমে অতিরিক্ত ২.৫ গ্রাম স্যাচুরেইটেড ফ্যাট যুক্ত করে।
সেদ্ধ বা পোচ: ডিম খাওয়ার স্বাস্থ্যকর উপায় হল সেদ্ধ বা পানিতে পোচ করা। এতে অতিরিক্ত কোনও চর্বি বা ক্যালোরি যোগ হয় না।
মার্কিন পুষ্টিবিদ লোরেঞ্জ, ডিম খাওয়ার সময় মাখন বা প্রক্রিয়াজাত মাংসের বদলে প্রচুর শাকসবজি এবং লাল আটার রুটি বা হোল গ্রেইনের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন, যা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী।
কারা ডিম কম খাবেন?
ডিম খাওয়া নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
মার্কিন পুষ্টিবিদ রেচেল ডিকম্যান জানান, গড়পড়তা মানুষের জন্য সপ্তাহে ৭টি ডিমের কুসুম খাওয়া ক্ষতিকর না হলেও, যাদের ইতোমধ্যে রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল রয়েছে, যারা হৃদরোগে ভুগছেন কিংবা ডায়াবেটিসের রোগী, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিম খাওয়া কিছুটা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই এই ধরনের বিশেষ শারীরিক অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডিমের সংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত।
