দেবী দুর্গার গায়ের রং কেমন, তা নিয়ে নানাজন নানা কথা বলেন। প্রচলিত মতে, দেবী ‘অতসী পুষ্পবর্ণা’, অর্থাৎ গলানো সোনার মতো তাঁর গায়ের রং। তবে তা বাদে ভারত তথা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দেখা মেলে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের দেবী মূর্তির। কোথাও লাল, কোথাও নীল, কোথাও আবার দেবীর শরীর উজ্জ্বল কালো রঙের।
শ্রীহট্টের ৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যমণ্ডিত লালবর্ণের দেবী দুর্গার পুজোর সূচনা হয়েছিল অসমের কামাখ্যা মন্দিরে। সর্বানন্দ দাস নামের এক সাধকের উদ্যোগে এ পুজোর সূত্রপাত। সর্বানন্দ দাস সে সময় কর্মসূত্রে অসমের শিবসাগর জেলায় মুন্সি পদে রয়েছেন। তিনি সংকল্প করেছিলেন, কামাখ্যা ধামে গিয়ে কুমারী পুজো করবেন। সেইমতো কামাখ্যা মন্দিরে গিয়ে স্থানীয় সেবায়েতের সহায়তায় পঞ্চবর্ষীয়া কুমারী নির্বাচন করলেন। মহাষ্টমীর দিন সেই কুমারীকে আসনে বসিয়ে শুরু হলো ষোড়শোপচারে স্বয়ং ভগবতীরূপে পুজো। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চললো মন্ত্রোচ্চারণ।
পুজো শেষ হবার পর সর্বানন্দ দেখলেন, কুমারী মেয়েটির গায়ের বর্ণ ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠেছে। বিস্মিত হয়ে তিনি দেবীকে প্রশ্ন করলেন “মা, আমার পুজো কি সিদ্ধ হয়েছে?” উত্তরে ভগবতীর লীলাময় কণ্ঠ ভেসে এল, “হ্যাঁ, সিদ্ধ হয়েছে। এই লাল বর্ণে তোর গ্রামে আমি আবির্ভূতা হয়েছিলাম, তুই এই মাতৃকালীকে লাল বর্ণেই পুজো করিস।“ সর্বানন্দ তখনও নিশ্চিত নন। বললেন, “প্রমাণ কী?” দেবী বললেন, “তোদের দুর্গামণ্ডপের দেওয়ালে আজও আমার হাতের ছাপ রয়ে গিয়েছে।” কথিত রয়েছে, সেই ছাপ পরে সর্বানন্দ খুঁজে পান।
সেই থেকেই পাঁচগাঁও-এ শুরু হয় লাল বর্ণের দুর্গাপুজো। মনে করা হয়, ভক্তের সমস্ত মানত পূরণ হয় এখানে। পুজোর সময় ভক্তেরা হোমযজ্ঞ করেন, ধূপ-ধুনো দেন। মনোবাসনা পূর্ণ করতে পশুবলিও দেওয়া হয়।
পুজোর সময় যানজট এড়াতে দর্শনার্থীদের পায়ে হেঁটে ২-৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। মহাঅষ্টমী ও মহানবমী তিথিতে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৩ সালে সপ্তমী ও নবমী পুজোর দিনে প্রায় হাজারখানেক পাঁঠা, ছয়-সাতটি মহিষ ও অগণিত হাঁস-পায়রা বলি দেওয়া হয়েছে এখানে।
ভক্তদের বিশ্বাস, এশিয়ার একমাত্র জাগ্রত লাল দুর্গা প্রতিমা এটিই। সিলেট বিভাগের অলিগলি পেরিয়ে পাঁচগাঁও গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ধানক্ষেতের পাশে এই দৃষ্টিনন্দন মন্দির। ভারত-বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ভক্তদের সমাগম ঘটে সেখানে। আয়োজক বংশের ষষ্ঠ পুরুষ, পুজো পরিচালক সঞ্জয় দাস সংবাদমাধ্যমকে জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া তাঁদের পুজো কখনও বন্ধ হয়নি।
ভক্তরা বছরের যেকোনও সময় এই মন্দির দর্শন করতে পারেন, তবে সবচেয়ে বেশি জমজমাট হয় দুর্গাপুজোর সময়। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও পাঁচগাঁওয়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ সময়ের লৌহশিল্পী জনার্দন কর্মকার ও বিপ্লবী লীলা নাগের জন্ম হয়েছিল এই গ্রামেই।
