কালবেলা · সাধারণ
বিবেকের মৃত্যুতে শোকসভা হয় না
২৪/১০/২০২৬

মানুষ মারা গেলে শোকসভা হয়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুতে শোকবার্তা আসে, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত হয়। কিন্তু একটি সমাজের বিবেক যখন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, তখন কোথাও শোকের আয়োজন হয় না। অথচ এই নীরব মৃত্যুর পরিণতি অনেক বেশি ভয়াবহ। কারণ একজন মানুষের মৃত্যু একটি জীবনকে শেষ করে, আর সমাজের বিবেকের মৃত্যু অসংখ্য মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে।
একটি সমাজের নৈতিক সংকট শুরু হয় শুধু অন্যায় সংঘটিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নয়, বরং তখন, যখন অন্যায়কে মানুষ স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, প্রভাব ছাড়া অধিকার মেলে না, ক্ষমতাবানের অন্যায়ের বিচার হয় না—এ ধরনের ধারণা যখন সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন আইন ও নৈতিকতার মধ্যে এক অদৃশ্য ব্যবধান তৈরি হয়।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম তার Anomie Theory-তে সামাজিক নিয়ম ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ার পরিণতি ব্যাখ্যা করেছেন। একটি রাষ্ট্রে আইন, আদালত ও প্রশাসন বিদ্যমান থাকলেও নাগরিকেরা যদি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন যে নিয়ম মেনে ন্যায্য অধিকার পাওয়া সম্ভব, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি সামাজিক আস্থাও দুর্বল হয়। মানুষ তখন অন্যায় প্রতিরোধের পরিবর্তে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতে পারেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সরকারি সেবা পেতে একজন নাগরিককে যদি নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ দিতে হয়, তিনি প্রথমে প্রতিবাদ করতে পারেন। কিন্তু বারবার হয়রানির পর একসময় হয়তো নিজেই অন্যকে পরামর্শ দেন—‘এসব কাজ এভাবেই করতে হয়।’ এখানেই অন্যায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সামাজিক অভ্যাসে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক তাই শুধু অর্থের অবৈধ লেনদেন নয়, মানুষের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাওয়া। এখানে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও রয়েছে। যখন আইনসম্মত সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ, সময় কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, তখন নাগরিকের প্রকৃত ব্যয় বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর চাপ বেশি পড়তে পারে। অর্থাৎ দুর্নীতি শুধু নৈতিকতার সংকট নয়, এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সুযোগের অসমতারও একটি উৎস। তবে অন্যায়ের শিকার মানুষের নীরবতাকে বিবেকহীনতা বলা যাবে না। অনেকেই প্রতিবাদ করেন না প্রতিশোধের ভয়ে, হয়রানির আশঙ্কায় কিংবা অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে। ফলে নীরবতার দায় শুধু ব্যক্তির নয়, যে প্রতিষ্ঠান অভিযোগের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তারও।
রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হান্না আরেন্টের Banality of Evil ধারণা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। মানুষ যখন নিজের কাজের নৈতিক পরিণতি বিচার না করে কেবল নির্দেশ, প্রচলিত নিয়ম কিংবা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের আড়ালে আশ্রয় নেন, তখন ব্যক্তিগত দায়বোধ দুর্বল হতে পারে। তাঁর তত্ত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও নৈতিক দায়িত্ব এড়ানোর এই প্রবণতা আধুনিক প্রতিষ্ঠানের আচরণ বিশ্লেষণে তাৎপর্যপূর্ণ।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘উপরের নির্দেশ।’ একজন কর্মচারী বলেন, ‘নিয়ম এভাবেই চলে।’ একজন রাজনৈতিক কর্মী বলেন, ‘দলের স্বার্থে করেছি।’ কিন্তু সবাই যদি নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন, তাহলে অন্যায়ের দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবেন? সমস্যাটি এখানেই। আমরা অনেক সময় অন্যায়ের বিচার করি কাজের প্রকৃতি দিয়ে নয়, কাজটি কে করেছেন তার পরিচয় দিয়ে। নিজের পছন্দের মানুষের অন্যায়কে পরিস্থিতির প্রয়োজন বলে ব্যাখ্যা করি, আর প্রতিপক্ষের একই আচরণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখি। এই দ্বৈত নৈতিকতা সমাজের ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে।
একটি সভ্য সমাজে নৈতিকতার মানদণ্ড ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতার পরিচয় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে না। অন্যায়ের বিচার হতে হবে প্রমাণ, আইন এবং ন্যায়নীতির ভিত্তিতে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু আইন প্রণয়নে নয়, সেই আইন নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করার সক্ষমতায়। আর সমাজের প্রকৃত শক্তি শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়ায় নয়, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহসে।
অন্যায়ের চেয়েও বিপজ্জনক হলো অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করা। কারণ অন্যায় যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে প্রতিকার চাওয়ার অধিকারটুকুও ভুলতে শুরু করে।
বিবেকের মৃত্যু তাই হঠাৎ ঘটে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট আপস, সুবিধাবাদী নীরবতা এবং অন্যায়কে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মধ্য দিয়েই তার সূচনা হয়। আর এই নীরব মৃত্যুর জন্য কোনো শোকসভা হয় না।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (ব্রামা)
মূল প্রতিবেদনে যান ↗