Published on
:
3 min read
‘রোজ অফিস থেকে এলে আমার মা আমার জন্য অপেক্ষা করতো। এখন কে আমার জন্য অপেক্ষা করবে?’ ক্রমাগত বিড়বিড় করে বিলাপের মতো বলে চলেছে ছেলেটা। উৎসবের আলো মাখা সপ্তমীতে মাকে সঙ্গে করে ঠাকুর দেখাতে বেরিয়ে যে এমনটা ঘটবে ভাবতেও পারেনি বছর ২৫-এর সৌরভ মণ্ডল। উৎসবে আলোর উজ্জ্বল শহরের বুকে এখন ১৯ শবের বোঝা। সে শবের মাঝে নিথর হয়ে শুয়ে সৌরভের মা মিঠু মণ্ডলও (৪৫) ।
আলোয় মোড়া কুমোরটুলির পাড়াটাতেও এখন নিকষ কালো শোকের ছায়া। ২৪ ঘণ্টা আগেই আসা খবরটা শুষে নিয়েছে উৎসবের সব আনন্দ। কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এ পাড়ার নিবাসী মিঠু মণ্ডলের। কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচেছেন তাঁর ছেলে সৌরভ। ভয়ঙ্কর সেই সন্ধ্যার কথা বলতে গিয়ে সৌরভের গলায় এখনও জড়িয়ে আতঙ্ক।
শনিবার সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আচমকা বৃষ্টি আর মণ্ডপে ঢোকার হুড়োহুড়ি মুহূর্তে বদলে দেয় সব কিছু। নিজের চোখের সামনে মাকে হারানোর সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁকে। সেই কথা উঠলেই বিলাপের সুরে তিনি বলেন, ‘জানেন, এক-দুই মিনিটের মধ্যে আমি আমার মাকে হারিয়ে ফেলি। চোখের সামনে মাকে মরতে দেখলাম। আমিও হয়তো বাঁচতাম না।’ কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মাকে হারানোর পরে এই কথাগুলিই বলছেন ২৫ বছরের সৌরভ মণ্ডল।
সৌরভ জানান, আচমকা বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরে মণ্ডপের বাইরে থাকা দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। ও দিকে বাইরে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে চাইছিলেন না কেউই। ফলে প্রবেশপথের সঙ্গে বেরনোর জায়গাতেও বাড়তে থাকে ভিড় ও ধাক্কাধাক্কি। তাঁর কথায়, ‘যখন আমরা এগজ়িট পয়েন্টের সামনে এসে গিয়েছি তখন খুব জোরে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। কেউই বাইরে যেতে চাইছিলেন না। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে যাঁরা গেটে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা উল্টে ফিরে এসে, ভিতরে ঢোকার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছিলেন।’ এর পরেই ক্রমশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ভিড়ের চাপ সামলাতে না পেরে একের পর এক মানুষ পড়ে যেতে থাকেন। সৌরভ বলেন, ‘চাপ সামলাতে না পেরে ভিতরে সবাই একে অপরের উপর পড়ে যান। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি আরও লোক আমার উপর পড়ছে। একটা সময়ে আমার নিশ্বাস আটকে যায়। মায়ের হাতটা ছেড়ে যায়।’
এর পরে ভিড়ে চাপা পড়ে যান ২৫ বছরের তরুণও। কয়েক মুহূর্ত পরে কোনওক্রমে নিজে সামলে উঠে উপুড় হয়ে পড়া লোকের ভিড় থেকে নিজের মাকে টেনে বার করেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
তার পরেই শিউরে ওঠার মতো সেই উপলব্ধি— ‘আমার চোখের সামনেই মা মারা গেলেন। আমি কিছু করতে পারলাম না। আমিও হয়তো বাঁচতে পারতাম না।’ ২৪ ঘণ্টা আগে যে মায়ের হাত ধরে আনন্দ করে বাড়ি থেকে পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন, সেই মাকে আর বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারেননি সৌরভ। এই আফসোস তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। চোরবাগান পুজোমণ্ডপের মৃত্যুফাঁদ, চিরজীবনের মতো কেড়ে নিয়েছে তাঁর পরম আপনজনকে।
FAQ
১. চোরবাগানের পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় সৌরভ মণ্ডলের কী হয়েছে?
কুমোরটুলির বাসিন্দা ২৫ বছরের সৌরভ মণ্ডল চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় প্রাণে বেঁচেছেন। তবে ওই দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর মা মিঠু মণ্ডলকে হারিয়েছেন।
২. চোরবাগানের দুর্ঘটনায় সৌরভের মায়ের নাম কী?
সৌরভের মায়ের নাম মিঠু মণ্ডল। তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর।
৩. কী ভাবে চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?
সৌরভের বয়ান অনুযায়ী, আচমকা বৃষ্টি শুরু হলে মণ্ডপের বাইরে থাকা দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। অন্য দিকে, ভিতরে থাকা অনেকে বাইরে বেরোতে পারছিলেন না। প্রবেশ ও নির্গমনপথে ভিড় ও ধাক্কাধাক্কি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
৪. কী ভাবে মায়ের হাত ছেড়ে যায় সৌরভের?
সৌরভ জানিয়েছেন, ভিড়ের চাপে একের পর এক মানুষ একে অপরের উপর পড়ে যাচ্ছিলেন। তিনিও চাপা পড়ে শ্বাস নিতে পারছিলেন না। সেই সময় মায়ের হাত ছেড়ে যায় তাঁর। পরে ভিড় থেকে মাকে টেনে বার করলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
৫. চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্ঘটনায় কত জনের মৃত্যু হয়েছে?
চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় বহু মানুষ আহতও হয়েছেন।
