প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের ঐতিহাসিক বৈঠক। আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এতে অংশ নিচ্ছেন না বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায় প্রতিনিধিদল বৈঠকে যোগ দেবে।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়া জোটের বাকি ছয় সদস্যদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা এই বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। এর আগে সোমবার (১২ অক্টোবর) সদস্যদেশগুলোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসবেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওই বৈঠক পরিচালনা করবেন, আর মূল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন স্বাগতিক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এছাড়া ভুটানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুংতেন দর্জি, মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল কো কো ও, নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং, শ্রীলঙ্কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দনা আবেরত্নে এবং থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসাক থংস্রি এই সম্মেলনে অংশ নেবেন।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দিল্লি সফরে না যাওয়ার নেপথ্যে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি কাজ করেছে বলে সরকারের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও যোগ দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে ভারত তাঁকে ওই অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানালেও, বাংলাদেশ সরকার তখন স্পষ্ট জানিয়েছিল যে আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। এদিকে ৪ অক্টোবর বিমসটেক সচিবালয়ে পাঠানো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিতে ১২ ও ১৩ অক্টোবরের বৈঠকের জন্য বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের চূড়ান্ত তালিকা পাঠানো হয়, যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংকক ঘোষণার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করে বিমসটেক। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান—এই সাত দেশ নিয়ে গঠিত এই জোটের সচিবালয় ঢাকায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ ২০২৫ সালের এপ্রিলে এর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০১৮ সালের ৩০ ও ৩১ আগস্ট নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত জোটের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর নেতারা নিয়মিতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের ২০তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আয়োজনের ধারণাপত্র অনুমোদিত হওয়ার পর অবশেষে এবার দিল্লিতে বসছে এই প্রথম অধিবেশন।
দিল্লির এবারের এই বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া মানব পাচার, মাদক পাচার, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে গত ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বিমসটেকের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক যৌথ কার্যকরী দলের একাদশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সন্ত্রাসবাদ দমন) সুহেল এজাজ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রচলিত নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি নতুন ধরনের অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা এবং উগ্রবাদ রোধে গঠিত উপদলগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়। এবারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সেই যৌথ কার্যকরী দলের সুপারিশগুলোও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে।
