কাগজে-কলমে আমদানির ঘোষণায় রয়েছে সাধারণ টুথপিক, কৃষি কাজের স্প্রেয়ার মেশিন, ট্রান্সফার পেপার কিংবা কারখানার স্টেইনলেস স্টিল। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের সিল কেটে কায়িক পরীক্ষা করতেই বেরিয়ে এলো চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য। কম শুল্কের সাধারণ পণ্যের আড়ালে চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী সামগ্রী, বিএসটিআই কর্তৃক নিষিদ্ধ ক্রিম, স্টেজ লাইট এবং গাড়ির দামি ইঞ্জিন পার্টস ও নাটবল্টু।
গতকাল শনিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার যৌথ অভিযানে এ ধরনের আটটি বড় জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে।
টুথপিকের চালানে নিষিদ্ধ ক্রিম ও স্প্রে : সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অসত্য ঘোষণার প্রমাণ মিলেছে পুরান ঢাকার চকবাজারের ‘কাফ কর্পোরেশন’-এর চালানে। চীন থেকে সাড়ে ২২ টন সাধারণ টুথপিক আমদানির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি টুথপিক। বাকি ১৫ দশমিক ৭ টনের পুরোটাই ছিল জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত ও বিএসটিআই কর্তৃক নিষিদ্ধ পাকিস্তানের ‘গোরি বিউটি ক্রিম’, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাস এবং যৌন উত্তেজক ‘ডিলে স্প্রে’। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
কৃষি মেশিনের নামে প্রসাধনী ও স্টেজ লাইট : ঢাকার নিউ মার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং’ চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি কৃষিকাজে ব্যবহৃত ‘পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন’ আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে কনটেইনারে মেশিনের বদলে পাওয়া যায় স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, সিরাম, বিভিন্ন ধরনের এলইডি লাইট ও ব্ল্যাক হেয়ার শ্যাম্পু। চালানে অতিরিক্ত ১ হাজার ৮১৭ কেজি পণ্যসহ প্রায় পুরোটাই ছিল ঘোষণাবহির্ভূত। এতে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা নস্যাৎ করা হয়।
গাড়ির দামি পার্টস ও ফ্লেক্স ব্যানার : ঢাকার ‘এইচআর এন্টারপ্রাইজ’ থাইল্যান্ড থেকে কম শুল্কের ‘ইঞ্জিন রবার বুশ’ আমদানির ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১৩ হাজার কেজি দামি ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, সেন্টার বিয়ারিং ও স্টিয়ারিং পার্টস নিয়ে আসে। এতে প্রায় ৪৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি গোয়েন্দা নজরদারির মুখে পড়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে এইচএস কোড পরিবর্তনের চেষ্টাও করে। এ ছাড়া ‘নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স’ হিট ট্রান্সফার পেপারের আড়ালে প্রায় সাড়ে ২১ টন উচ্চ শুল্কের পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার এনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা চালায়।
স্টিল সার্কেলের আড়ালে শত টন নাটবল্টু : পুরান ঢাকার বংশালের ‘নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ’ এবং ওয়ারীর ‘মোহাম্মাদীয়া ট্রেড’ স্টেইনলেস স্টিল ও এক্সকাভেটর পার্টসের আড়ালে কনটেইনার ভর্তি করে উচ্চ শুল্কের বিপুল পরিমাণ নাটবল্টু, স্কু, ভারী রোলিং
বিয়ারিং ও চেয়ারের গ্যাস লিফ্ট সিলিন্ডার নিয়ে আসে। এ দুটি চালানে যথাক্রমে ৩২ লাখ ও ৪২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়।
লক ভেঙে গায়েবি সিল লাগিয়ে চুরির অপচেষ্টা : সবচেয়ে স্পর্ধিত ঘটনাটি ঘটে কাফ করপোরেশনের আরেকটি চালানে। জালিয়াতির তথ্যে চালানটি অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে আগেই ‘লক’ করে কাস্টমস। কিন্তু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সহযোগিতায় কায়িক পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর কনটেইনারটি বন্দর শেডে নামিয়ে (কিপ ডাউন) মূল সিল ভেঙে একটি ভিন্ন সিল লাগিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি বদলি হয়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে কনটেইনারটি বন্দর থেকে সরিয়ে ফেলার ফন্দি আঁটা হয়েছিল। তবে বিষয়টি ধরা পড়ার পর কনটেইনারটি তাৎক্ষণিক জব্দ করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, সুসংগঠিতভাবে রাজস্ব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় ফৌজদারি মামলাসহ সর্বোচ্চ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
