লাগেজ কাটা বা চুরির বিষয়ে ‘প্রচলিত ধারণা’ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম আবু নওশাদ খান। বিমানবন্দরে নিযুক্ত এ কর্মকর্তার মতে, লাগেজ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। লাগেজ কাটা বা চুরির চেষ্টা করা হলে তার প্রমাণ থেকে যাবে এবং জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
পোস্টে নওশাদ খান জানান, বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি বিশেষ সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ৬৫ ইঞ্চি আকারের ১৮টি ফোরকে মনিটরের মাধ্যমে লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে। এতে যাত্রীরা উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো ও বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ দেখতে পারছেন।
এ উদ্যোগের জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
পোস্টে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ বলেন, ‘আমাদের বিমানবন্দরেই লাগেজ কাটা বা চুরি হয় এরকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে।’ এ বিষয়ে তিনি তার পোস্টে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
বিমানবন্দরে লাগেজ কীভাবে আসে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে নওশাদ লেখেন, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানে করে দুইভাবে যাত্রীদের লাগেজ আসে।’
প্রথম পদ্ধতি হিসেবে তিনি বলেন, ‘ওয়াইড বডি বিমানে আলাদা কন্টেইনারের মাধ্যমে যাত্রীদের লাগেজ আসে, যা লক করা অবস্থায় নামিয়ে বিশেষ বাহনে করে সরাসরি সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রথম মানুষের হাতের স্পর্শে আসে। অর্থাৎ এখানে লাগেজ কাটা বা কোনো কিছু চুরি করার সুযোগ নেই। যদি কেউ চেষ্টা করে তবে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাসহ কয়েকটি সংস্থার সিসিটিভি ফুটেজে রেকর্ড হয়ে যায় ও আমরা লাইভ দেখতে পারি।’
ছোট উড়োজাহাজের লাগেজ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি লেখেন, ‘ন্যারো বডি বা ছোট বিমানের কার্গো হোল্ডে বড় বাসের লাগেজ যেভাবে বক্সে থাকে, অনেকটা সেভাবে যাত্রীদের লাগেজ আসে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজের সামনে বা বেশ খানিকটা দূরে রিমোট বে এলাকায় বিমান নামার পরে তিনজন ব্যক্তি বডি ওর্ন ক্যামেরা চালু করে বিমানের কার্গো হোল্ডের ভেতরে ঢুকে লাগেজ নামান।’
নওশাদ খান আরও বলেন, ‘তাদের সব কর্মকাণ্ড বডি ওর্ন ক্যামেরায় রেকর্ড হয়। ক্যামেরার রেকর্ড নির্দিষ্ট স্থানে জমা দিলেই সার্ভারে আপলোড হয়ে যায়। এসব রেকর্ড ৯০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। বডি ওর্ন ক্যামেরা কোনো কারণে বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর।’
লাগেজের নিরাপত্তা তদারকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উভয়ক্ষেত্রেই নীচে থাকা আরেকজন চেকার তাদের বডি ওঠার ও নামার সময় সার্চ করে। সেখানে কোনো কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজ আসলে সেটাও ছবি তুলে রেখে স্পেশাল রেজিস্টারে নোট করে রাখা হয়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘সুতরাং কেউ লাগেজ চুরি বা কাটতে চেষ্টা করলে অবশ্যই ধরা পড়ে যাবে। অর্থাৎ লাগেজ কাটা বা চুরির চেষ্টা করলে তার সম্পূর্ণ প্রমাণ থেকে যাবে এবং তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে দেশে এসে অনেক যাত্রী লাগেজ কাটা বা খোলা অবস্থায় পাওয়ার পর বিমানবন্দরে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করেন উল্লেখ করে নওশাদ খান লেখেন, ‘প্রকৃতপক্ষে অনেক সময় সিকিউরিটি আইটেম, দাহ্য, ঝুঁকিপূর্ণ বা বহন নিষিদ্ধ বস্তু আছে বলে সন্দেহ হলে উৎস দেশের বিমানবন্দরে টিএসএ (TSA)-অনুমোদিত নম্বরযুক্ত লক না থাকলে তালা ভেঙে সেই বস্তু বাজেয়াপ্ত করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা তালা খোলা লাগেজে এ-সংক্রান্ত নোটিশ পাঠায় না। যার ফলে অস্পষ্টতা ও ভুল ধারণা তৈরি হয়।’
অন্য বিমানবন্দরে লাগেজ থেকে কোনো কিছু হারিয়েছে কি না, তা জানার সুযোগও অনেক সময় কম থাকে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ‘পৃথিবীর খুব বেশি বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয় না। একই সঙ্গে খুব বেশি বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সম্প্রচারও করা হয় না।’
লাগেজ কাটা বা কোনো কিছু হারানোর ঘটনা ঘটলে করণীয় সম্পর্কে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লেখেন, ‘আপনার লাগেজ থেকে কিছু মিসিং হলে বা কাটা পেলে বিমানবন্দর ত্যাগ করার আগে অবশ্যই লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড কাউন্টারে অভিযোগ জানান।’
বিমানবন্দর নিয়ে অপপ্রচার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন, প্রকৃত বাস্তবতা জানার চেষ্টা করি। ভালো কাজ থাকলে অনুপ্রাণিত করি। দেশকে ভালোবেসে দেশের যতটুকু ভালো, সেটা নিয়ে গর্ব করি, মানুষকে সঠিক বিষয় জানাই।’
যাত্রীদের অভিযোগ ও পরামর্শ জানানোর জন্য বিমানবন্দরের হটলাইন নম্বর ১৩৬০০ ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া বিধি অনুযায়ী যথাযথ সেবা না পেলে বা যাত্রী অধিকার লঙ্ঘিত হলে বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ০১৩০৪০৫০৬০৩-এ জানানোর আহ্বান জানান।
