২৫ কেজি ওজনের দুটি কাতল মাছ নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী সাজিদুল ইসলাম। অটোরিকশা থেকে নেমে আঙিনায় পা রাখতেই কলেজপড়ুয়া শ্যালক-শ্যালিকারা খুশিতে নেচে উঠতে শুরু করে। দুই জামাই ও নাতি-নাতনিদের চমকে দিতে দেলোয়ার হোসেনও এনেছেন মাছের আকৃতির ছয় কেজি ওজনের বড় মিষ্টি। এমন দৃশ্য বছরে একদিন, মাঘ মাসের শেষ বুধবার চোখে পড়ে বগুড়ার ঘরে ঘরে। দিনটি ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলাকে ঘিরে।
শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে গাবতলীর গোলাবাড়ীসংলগ্ন পোড়াদহে বসে এ মেলা। একদিনের এ আয়োজনকে ঘিরে আশপাশের গ্রামগুলোয় চলে তিন দিনব্যাপী জামাই উৎসব। মেলায় কেনা বড় মাছ ও হরেক রকমের মিষ্টি দিয়ে জামাইদের আপ্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি উপহার হিসেবে কেনা হয় কাঠের আসবাব।
ঠিক কবে এ মেলার সূচনা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, এর সূচনা ষোড়শ শতাব্দীতে। কথিত আছে, প্রায় ৪০০ বছর আগে এক সন্ন্যাসী বটবৃক্ষের নিচে আসন গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে সেখানে বহু সন্ন্যাসীর সমাগম ঘটে। পরে সেখানে গড়ে ওঠে একটি আশ্রম। সেই সময় থেকে স্থানীয়রা মাঘ মাসের শেষ তিনদিনের মধ্যে বুধবার সন্ন্যাসীপূজা উদযাপন শুরু করেন। কালক্রমে তা মেলায় রূপ নেয়। প্রথম দিকে এর নাম ছিল সন্ন্যাসী মেলা। পরে জায়গার নাম অনুসারে এটি পোড়াদহ মেলা নামে পরিচিতি পায়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘জামাই মেলা’ ও ‘মাছের মেলা’ নামেও পরিচিত। আয়োজনের দ্বিতীয় দিন বসে বউ মেলা।
পোড়াদহ মেলাকে ঘিরে আশপাশের গ্রামের বাড়িগুলোয় আত্মীয়-স্বজনের সমাগম ঘটে। জামাই-মেয়েসহ আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করে ধুমধাম করে খাওয়ানো এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। প্রথম দিনে ভিড় বেশি থাকায় স্থানীয় নারীদের কেনাকাটা ও ঘোরাঘুরির সুবিধার্থে পরদিন বউ মেলার আয়োজন করা হয়। এদিন নারীদের উপস্থিতিই বেশি থাকে। কয়েক হাজার দোকানের পসরা নিয়ে বসা এ আয়োজনে বড় বড় মাছের কেনাবেচাই প্রধান আকর্ষণ। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
বগুড়া অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন এখন অনেকের কাছে ‘জামাই মেলা’ নামেও পরিচিত। এখানে বড় বাগাড়, বোয়াল, কাতলা, রুই, ব্ল্যাক কার্প, গ্লাস কার্প, মৃগেল, সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, চিতলসহ দেশী-বিদেশী নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। কোনো কোনো বাগাড়ের ওজন হয় ৫০-৮০ কেজি পর্যন্ত। মাছের পাশাপাশি বিক্রি হয় ১০-১৫ কেজি ওজনের মাছের আকৃতির মিষ্টিও।
মাছ ও মিষ্টির পর মেলার অন্যতম আকর্ষণ কাঠের তৈরি বিভিন্ন ধরনের আসবাব। এখানে রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাপি, নিমকি, খৈ তিলের নাড়ু, খই ও শুকনো মিষ্টিসহ নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। দেড়-দুই কেজি ওজনের মিষ্টিও এ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি রয়েছে প্রসাধনসামগ্রী, খেলনা, উপহারসামগ্রী, চুড়ি, কানের দুল, মালা, কাজলসহ নানা পণ্যের দোকান। এছাড়া কাঠ, স্টিল ও লোহার তৈরি বিভিন্ন ধরনের আসবাবও কেনাবেচা হয়।
