রাজধানীর আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয় সরিয়ে শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সচিবালয় নির্মাণের পাশাপাশি এলাকাটিতে চক্রাকার সড়ক ও নতুন সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরদিনই প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দেয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, সরকার দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করে নিজেদের মেয়াদে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে চায়।
বৈঠকে উপস্থিত স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে বৈঠকে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে তিনটি পৃথক নকশা উপস্থাপন করা হয়। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সবাই একমত হন।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত নকশার ভিত্তিতে প্রকল্প তৈরি করা হবে। নকশাগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়ও উপস্থাপন করা হবে।
আগেও নেওয়া হয়েছিল স্থানান্তরের উদ্যোগ: গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে এ জন্য ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ হয়। তখন ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জিয়া উদ্যানের উত্তর দিকে এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে, যেখানে প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হতো, সেখানে ৩২ একর জমিতে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের মূল পরিকল্পনা অনুসারে নতুন সচিবালয় নির্মাণ করা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চার লাখ ডলার ব্যয়ে মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের করা জাতীয় সংসদ ভবনসহ পুরো শেরেবাংলা নগরের মূল নকশা দেশে আনা হয়েছিল। ওই নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে ১৪ তলা ভিতের ওপর নয়তলাবিশিষ্ট চারটি মূল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত সে উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও সচিবালয় স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা হয়নি।
নতুন বিএনপি সরকারের আমলে বর্তমান সচিবালয়ের ভেতরে ২১ তলা একটি ভবন নির্মাণে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হলে অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
প্রাথমিক ব্যয় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা: সচিবালয় কোথায় স্থানান্তর করা যায়, তা নিয়ে গত পাঁচ মাসে অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এ সময় সম্ভাব্য স্থান, স্থাপনার নকশা ও অবকাঠামোগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের তিনটি দল তিনটি পৃথক নকশা উপস্থাপন করে। সভায় একটি নকশা চূড়ান্ত করে তার ভিত্তিতে প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরকে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
চক্রাকার সড়ক, পাতালপথের পরিকল্পনা: প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, নতুন সচিবালয়ের চারপাশে চক্রাকার সড়ক নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে একটি নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সড়কটি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর, অর্থাৎ সাবেক গণভবনের পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কে যুক্ত হবে।
জাদুঘরের পাশে স্কুল, হাসপাতাল, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণ করতে গেলে এসব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের নিচ দিয়ে একটি পাতাল সড়ক নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওপরের সড়ক দিয়ে প্রস্তাবিত সচিবালয়ে প্রবেশ করা যাবে এবং নিচের সড়ক দিয়ে মিরপুর সড়কে যাওয়া যাবে। এ জন্য পৃথক প্রকল্প নেওয়া হতে পারে।
প্রস্তাবিত নকশায় সচিবালয়ের প্রতিটি ভবন হবে ১২ তলা। জাতীয় সংসদ ভবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবনগুলোর নকশা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমান সচিবালয়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জায়গা: গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আবদুল গনি রোড থেকে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়া হলে বর্তমান সচিবালয় ভবনে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর স্থানান্তর করা হতে পারে।
বর্তমান সচিবালয়ে জায়গার স্বল্পতার কারণে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজ করতে সমস্যা হয়। এ ছাড়া সচিবালয়কে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়, যাতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। বর্তমান সচিবালয়ের আয়তন ১৭ লাখ বর্গফুট। প্রস্তাবিত নকশায় নতুন সচিবালয়ের আয়তন হবে ৩১ লাখ বর্গফুট।
শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন। ২০২১ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে মাঠটি অনেকটা খালি পড়ে আছে। সেখানে পার্ক নির্মাণে চার বছর আগে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের মতে, মাঠটি এভাবে খালি পড়ে থাকলে একসময় কেউ না কেউ দখল করে নিতে পারে। সচিবালয় স্থানান্তর করা হলে জায়গাটি দখলের আশঙ্কা থাকবে না।
‘যানজটের অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে’: তবে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তাঁর মতে, ১৯৬৯ সালে তৈরি লুই আই কানের নকশার আলোকে ২০২৬ সালে এসে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত যথাযথ হবে না। মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো বাংলাদেশেও সচিবালয় অন্য কোনো স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
ইকবাল হাবিব বলেন, শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ে ইতিমধ্যে অনেক সরকারি স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে ওই এলাকায় যানবাহনের সংখ্যাও বেড়েছে। নতুন করে সচিবালয় নির্মিত হলে যানজটের পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও বলছে, শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যানজট নিয়ন্ত্রণ। যদিও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই এলাকায় যানজটমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সানা/আপ্র/১১/১০/২০২৬
