সারা দেশে যন্তরমন্তর গড়ে উঠবে
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে যন্তরমন্তর থেকে আটক করা হয়েছে। এর আগে এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করেন রাঙ্কা, যার ক্যাপশন ছিল যন্তরমন্তর থেকে হাত সরান!
- দিল্লীতে নারীদের মারধর ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে যন্তরমন্তর থেকে আটক করা হয়েছে। এর আগে এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করেন রাঙ্কা, যার ক্যাপশন ছিল যন্তরমন্তর থেকে হাত সরান! ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, রাঙ্কা ও অন্যরা যন্তরমন্তরের একটি ফটক ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করছেন। এরপরই পুলিশ তাদের আটক করে। হিন্দুস্তান টাইমস, এএনআই, পিটিআই, এক্স।
এদিকে, বিক্ষোভস্থল হিসেবে যন্তরমন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার কথা বলেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। পিটিআই বার্তা সংস্থার বরাতে জানা যায়, তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নরেন্দ্র মোদির ভয় স্পষ্ট, কারণ তিনি যন্তরমন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি ভাবছেন, যন্তরমন্তর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল না থাকলে বিক্ষোভ থেমে যাবে, কিন্তু তা হবে না। এখন সারা দেশে যন্তরমন্তর গড়ে উঠবে। নরেন্দ্র মোদির সমস্যা যন্তরমন্তর নামের জায়গা নিয়ে নয়, বিক্ষোভ নিয়ে। এটা আমাদের বুঝতে হবে।
নারীদের মারধর ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে দিল্লীতে চলমান বিক্ষোভে আটক নারী আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, পুলিশের ভ্যানে তোলার পর নারী পুলিশ সদস্যরা তাদের মারধর করেন। এমনকি কয়েকজনের গলা চেপে ধরা এবং যৌনাঙ্গে লাথি মারার অভিযোগও করেছেন তারা। এ সময় তাদের মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ডট ইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নওরিন নামের এক নারী বিক্ষোভকারী এসব অভিযোগ করেন। তিনি ওয়ার্কার্স পার্টি অব ইন্ডিয়ার সদস্য।
নওরিনের ভাষ্য, রোববার মধ্য দিল্লীতে তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলেন। একপর্যায়ে পুলিশ এসে ১৬ জনকে আটক করে একটি ভ্যানে তোলে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ জনই নারী ছিলেন বলে দাবি তার।
নওরিন অভিযোগ করেন, ভ্যানে তোলার পর নারী পুলিশ সদস্যরা একে একে তাদের মারধর করতে শুরু করেন। দিশা স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের সদস্য শারন্যাকে ভ্যানের ভেতরে ফেলে এক নারী পুলিশ সদস্য তার গলা চেপে ধরেন। আরেক পুলিশ সদস্য কনুই দিয়ে তাকে আঘাত করেন বলেও অভিযোগ করেন নওরিন। পরে এক পুলিশ সদস্য শারন্যাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান বলে জানান তিনি।
নওরিনের আরও দাবি করেন, ভ্যানে থাকা অন্য নারী বিক্ষোভকারীদের বুক ও যৌনাঙ্গে আঘাত করা হয়। তাদের কয়েকজনের মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায় নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে- এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে শনিবার ও রোববার দিল্লিতে বিক্ষোভ করেন ককরোচ জনতা পার্টিসহ বিভিন্ন ছাত্র ও প্রতিবাদী সংগঠনের সদস্যরা। তাদের যন্তর মন্তরে যাওয়ার কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিক্ষোভকারীরা ওই এলাকার দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং অনেককে আটক করে।
ময়দান ভাড়া নিতে হবে
ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ দেখানো বন্ধ করে দিয়েছে। দিল্লীতে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য তিনটি স্থানও নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ঘটনা হলো, সেখানে বিক্ষোভ আয়োজন করতে হলে এখন থেকে গাঁটের অর্থ খরচ করতে হবে। ব্যবস্থাটা এমন, ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’।
সব বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠন সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। মামলাও দায়ের হচ্ছে। তাতে কী সুরাহা হবে, কেউ জানে না। এটুকু সবাই বুঝতে পারছে, নরেন্দ্র মোদির সরকার চায় না চোখের সামনে প্রতিবাদকারী মানুষেরা বসে থাকুক। স্লোগান দিক। আন্দোলনের ঢেউ জনজীবনে প্রভাব ফেলুক। তাই, এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত।
শুধু অর্থ খরচের প্রশ্নই নয়, নতুন তিন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা চাইলেই অবস্থান বা ধরনায় বসতে পারবেন না। জায়গা খালি আছে কি না, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। সেই অনুযায়ী বিক্ষোভ কর্মসূচি তৈরি করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রামলীলা ময়দানে ককরোচ জনতা পার্টিকে (সিজেপি) বিক্ষোভের আয়োজন করতে এই বছরের মাত্র তিনটি দিন তাদের জন্য বরাদ্দ হতে পারে। সেই তিনটি দিন হচ্ছে ডিসেম্বরের ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ। কেননা বাকি সব দিন সেখানে কিছু না কিছু হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট যদি হস্তক্ষেপ না করে, লুটেন্স দিল্লীর হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি যন্তরমন্তর বিক্ষোভ সমাবেশের জন্য সত্যি সত্যিই বন্ধ হয়ে গেলে ধরে নিতে হবে, রাজধানী দিল্লীতে শাসকের নজরের আওতায় কেউ আর কোনো দিন ‘বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে অশান্তি’ সৃষ্টি করতে পারবে না।
গাছগাছালিতে ভরা এই জায়গা থেকে রামলীলা ময়দানের দূরত্ব অন্তত চার কিলোমিটার। ২০১১ সালে যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করলেও দ্বিতীয় দফার আন্দোলনের জন্য প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারে ১২ একর জায়গা জোড়া রামলীলা প্রাঙ্গণকেই বেছে নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জন্ম হয় আম আদমি পার্টিরও (আপ)। এখন সেখানে আন্দোলন করতে গেলে ময়দান ভাড়া নিতে হবে। দিনের খরচ ১ লাখ ২১ হাজার ৮০ রুপি।
এর ওপর ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ ৫৫ হাজার রুপি। একই ব্যবস্থা পূর্ব দিল্লির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের ক্ষেত্রেও। এই মাঠও রামলীলা ময়দানের মতো ১২ একরের। তবে দূরত্ব তিন গুণ, ১২ কিলোমিটার। এর মালিক দিল্লী ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ)। সেখানে বিক্ষোভ, ধরনা বা অবস্থানের জন্য কেউ এক দিনের জন্য তিন হাজার বর্গমিটার ভাড়া নিতে চায়, কড়কড়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার রুপি তাদের পকেট থেকে বের করতে হবে। সিকিউরিটি ডিপোজিট ৯৫ হাজার।
উত্তর দিল্লরি বুরারি ময়দান যন্তরমন্তর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে। ৫৭ একর জমির ওপর এই ময়দানেরও মালিক ডিডিএ। ডিডিএর ওয়েবসাইটে ভাড়ার উল্লেখ নেই। যদিও জানা যাচ্ছে ময়দান আংশিকভাবেও ভাড়া নেওয়া যায়।
তবে শুধু এটুকুই নয়, কড়ি ফেলেও তেল মাখা যাবে কি না, তা নির্ভর করবে দিল্লী পুলিশের মর্জির ওপর। বিয়েশাদি, সম্মেলন, মেলা, রামলীলা, নবরাত্রি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক জনসভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি সত্ত্বেও বিক্ষোভ দেখানোর দিন পাওয়া গেলেও দিল্লি পুলিশের অনুমতি না মিললে কিছুই করা যাবে না। অর্থাৎ সরকার যদি না চায়, সিজেপি বা ইন্ডিয়া, কারও সাধ্য হবে না নির্দিষ্ট স্থানে বিক্ষোভ দেখানোর।
নির্বাচনী জনসভা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলই এই তিন ময়দান বিক্ষোভ বা আন্দোলনের জন্য ভাড়া নেয় না। নেয় না, তাদের দাবিদাওয়া সরকারের কানে পৌঁছবে না বলেই। রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার কথা জানাতে বা বিক্ষোভের জন্য টাকা দিয়ে জায়গা ভাড়া করার সংস্কৃতি ভারতে এখনো চালু হয়নি। মোদি সরকার যদিও তেমনটাই চাইছে।
নব্বইয়ের দশকে নরসিংহ রাও সরকার বোট ক্লাব জনবিক্ষোভ বা জনসমাবেশের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। সেই থেকে যন্তর মন্তরই হয়ে উঠেছিল ক্ষোভ–বিক্ষোভ দেখানোর জায়গা। এখান থেকেই নির্ভয়ার মা সুবিচার পেয়েছিলেন। এখানেই প্রথম আলোড়ন ফেলেছিলেন সিএএ–বিরোধী আন্দোলনকারীরা। মহিলা কুস্তিগিরেরা এখানেই শুরু করেছিলেন বিজেপি দলীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার প্রতিবাদে অবস্থান। আগামী দিনে যন্তরমন্তরের ভাগ্যে কী লেখা আছে, তা হয়তো একমাত্র সুপ্রিম কোর্টই ঠিক করে দিতে পারেন।
