নিজস্ব চিত্রএই সময়
Published on
:
3 min read
এই সময়: রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক পুজোমণ্ডপের বাইরে বামেদের বুক স্টল ভাঙা নিয়ে বিজেপিকে যখন কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে, তখন শাসকদলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাফ জানিয়ে দিলেন, এই সব ঘটনার সঙ্গে বিজেপির দূর–দূরান্তের কোনও যোগ নেই। তাঁর সন্দেহ, বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বদনাম করার জন্য কেউ কেউ বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙছে। এর মধ্যেই উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় সরকারি জমিতে সিপিএমের বুক স্টল তৈরির জন্য কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া অনুমতি খারিজ করে দিয়েছে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।
শুক্রবার শমীক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যারা বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙছে, তাদের তিনি চেনেন না। সরাসরি বামেদের বইয়ের স্টলের প্রসঙ্গ উত্থাপন না–করে এ দিন হাওড়ার বি গার্ডেন আইএইচই ওয়েলফেয়ার কমিটির দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে দিয়ে শমীকের বার্তা, ‘এই সমাজে প্রত্যেকের মত প্রকাশের অধিকার আছে। এটা চিন, কোরিয়া অথবা পাকিস্তান নয়। এটা ভারতবর্ষ। যে ভারতবর্ষের প্রাথমিক শর্তই হলো বিরোধিতার অধিকার। আমরা বহুত্ববাদের সমাজে বাস করি।’ তাঁর সংযোজন, ‘কেউ যদি মত প্রকাশ করতে চায়, সেই অধিকার তাঁকে দিতে হবে।’ সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বিজেপি–র রাজ্য সভাপতির আহ্বান, ‘শাসকদলের নাম ব্যবহার করে কোথাও যদি এই ধরনের নিন্দনীয় ঘটনা ঘটানো হয়, তা হলে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদ করবেন। পুলিশকে জানাবেন। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’ শমীকের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, বামেদের বুক স্টল ভাঙচুরের ঘটনার প্রেক্ষিতেই এই মন্তব্যগুলি করেছেন তিনি।
প্রতি বছরই নিয়ম করে বারোয়ারি দুর্গামণ্ডপগুলির বাইরে বইয়ের স্টল দেয় বামপন্থী দলগুলি। কিন্তু এ বার তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুজো কমিটিগুলিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন যাতে, দুর্গাপুজো না–লিখলে বামেদের স্টলের অনুমতি না–দেওয়া হয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগের তির রাজ্যের শাসকদল বিজেপির দিকে। বৃহস্পতিবার রাতে হাওড়ার শিবপুরে বামেদের একটি বইয়ের স্টলে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সব নিয়ে জল গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। এই আবহে শুক্রবার শমীক বুঝিয়ে দিয়েছেন, বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙাকে তিনি সমর্থন করেন না। এবং তাঁর দলও এ সবে জড়িত নয়। এ দিন শমীক সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘কোনও স্টল ভাঙচুরের সঙ্গে বিজেপির দূর–দূরান্তের সম্পর্ক নেই। অতীতে সিপিএম তাণ্ডব চালিয়েছে। পরবর্তীতে তৃণমূল এসেছে। কিছু সিপিএম তৃণমূল হয়ে গিয়েছে। এ বার কিছু লোক ‘হঠাৎ বিজেপি’ হয়েছে। তারা কোনও কোনও জায়গায় পুরোনো রাগ মেটানোর চেষ্টা করছে। আমি এদের চিনি না।’ তাঁর আশঙ্কা, ‘বিজেপিকে কলঙ্কিত করা এবং রাজ্য সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য এই ধরনের কাজ করছে কেউ কেউ।’
এর পরেই ‘তৎকাল বিজেপি’র উদ্দেশে শমীকের হুঁশিয়ারি, ‘বিজেপিতে যারা তৎকাল হয়ে এসেছে, তাদের টিকিট কনফার্ম হবে না। ওরা ট্রেনেই উঠতে পারবে না।’ যদিও সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের দাবি, ‘কখনও কসবা, কখনও হাওড়া, কখনও বিরাটি, কখনও ভাটপাড়া— রাজ্যের আরও অনেক জায়গায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা এগুলি প্রতিহত করব। বই পড়া, বই ছাপা, বই বিক্রি করা কোনও সরকারই বন্ধ করতে পারে না। পুলিশ আর স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে আমাদের দাবি, যারা বইয়ের স্টল ভাঙচুর করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
শুক্রবার সন্ধেয় এন্টালিতে বামেদের স্টল ভাঙচুর হয়েছে। এর আগে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া, উত্তর ২৪ পরগনার বীজপুর, কলকাতার মানিকতলা, বেহালা চৌরাস্তা, শ্যামবাজারে বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। সিপিএম নেতা কলতান দাশগুপ্তের বক্তব্য, ‘রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে উস্কানি দিয়েছিলেন যে, বামেদের বুক স্টল করতে দেওয়া হবে না। সেই উস্কানিই বিজেপির মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে।’
তবে এ দিন হাইকোর্টের নির্দেশে বামেদের বিড়ম্বনা কিছুটা বাড়বে বলে মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। সম্প্রতি বনগাঁ এবং নৈহাটিতে সরকারি জমিতে দুর্গাপুজোয় দু’টি বুক স্টল করতে চেয়ে আবেদন জানায় সিপিএম। কিন্তু অভিযোগ, তাতে পুলিশের অনুমতি মেলেনি। বনগাঁয় সিপিএমের বুক স্টল তৈরিতে বৃহস্পতিবার অনুমতি দেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। তাঁর এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ডিভিশন বেঞ্চে যায় রাজ্য সরকার। শুক্রবারই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্রনাথ ভি ঘুগের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, অনুমতি নেওয়া না–থাকলে স্টল তুলে দিতে হবে।
এ দিনের শুনানিতে বনগঁার ওই জায়গার ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চে’র বুক স্টল তৈরির অনুমতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। অনুমতি না–থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, ‘এক জনের বাড়ির সামনে অন্য কেউ কী ভাবে স্টল তৈরি করতে পারে? কোনও নীতি চালু হলে তা সবার জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য হবে। চল্লিশ বছর ধরে আইন কার্যকর হয়নি বলে এ বছরও তা প্রয়োগ করা যাবে না, এমন হতে পারে না।’ আগামী ২১ জানুয়ারি সিঙ্গল বেঞ্চে মামলার পরবর্তী শুনানি।