রাজধানী ঢাকার যানজট কমানো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে চারটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বাস মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব পরিকল্পনার তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমানো, গণপরিবহনের চলাচলে শৃঙ্খলা আনা এবং সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব পরিকল্পনার সুফল পেতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের একটি অংশ যান্ত্রিক ত্রুটি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনের কারণে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার।
তবে পুরোনো বাস অপসারণের ফলে গণপরিবহনের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। এ কারণে বিকল্প বাসের ব্যবস্থা, যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই এবং পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাসের চাপ, যাত্রী ওঠানামা ও পার্কিংয়ের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এসব এলাকার টার্মিনাল স্থানান্তর কিংবা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা গেলে কেন্দ্রীয় সড়কে বাসের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে টার্মিনাল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নতুন স্থানের সঙ্গে নগর পরিবহনের সংযোগ, যাত্রীদের যাতায়াতের সময়, ভাড়া ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। শহরের প্রান্তে টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার পর পর্যাপ্ত সংযোগকারী বাস বা অন্যান্য গণপরিবহনের ব্যবস্থা না থাকলে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। আন্তঃজেলা বাসের যাত্রা শুরু ও শেষের স্থান এবং মহানগরীর অভ্যন্তরীণ বাস চলাচলের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি।
রাজধানীর পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এ উদ্যোগের আওতায় কোন কোন রুট থাকবে এবং কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রুট সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু সড়কের অবকাঠামো নয়, বাস চলাচলের পথ, যাত্রী ওঠানামার স্থান, নির্ধারিত স্টপেজ, সংযোগকারী সড়ক এবং যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ঢাকার বিভিন্ন সড়কে একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো এবং যাত্রী তোলার জন্য হঠাৎ লেন পরিবর্তনের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। রুট পুনর্বিন্যাসের সময় এসব সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া হলে গণপরিবহনের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে যাত্রী চলাচলের তথ্য, কর্মব্যস্ত সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের অবস্থান এবং মেট্রোরেলসহ অন্যান্য পরিবহনের সঙ্গে সংযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলাচল, যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের যোগ্যতা, নিরাপত্তার মান, অনুমোদিত চলাচল এলাকা, পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নির্ধারণের বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা, নির্ধারিত স্ট্যান্ড এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চালক, মালিক ও যাত্রীদের মতামত নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে তা বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে পুরোনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, রুট সংস্কার ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে কার্যকর করাই এ উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য।
এ জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), দুই সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহনমালিকদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি বাসের গড় যাত্রাসময়, যানজটের স্থায়িত্ব, গণপরিবহনে যাত্রীর সংখ্যা এবং সড়ক দুর্ঘটনার হার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
রাজধানীর সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় শুধু নীতিমালা বা অবকাঠামোগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক তদারকি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, জনসম্পৃক্ততা এবং গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চারটি উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার যানজট কমানো ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
The post ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৪ উদ্যোগ সরকারের appeared first on ভোরের চেতনা.
