লালনমেলায় মাদকবিরোধী অভিযান, জব্দ ২ হাজার গাঁজার কলকে!
ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিনের লালন উৎসব। আগামী ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই আয়োজনকে মাদকমুক্ত রাখতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার দুপুরে লালন আখড়াবাড়ির মেলার মাঠ থেকে প্রায় দুই হাজার গাঁজা সেবনের কলকে জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার করা এসব কলকের আনুমানিক মূল্য দুই লাখ টাকার বেশি। এবার মাদকমুক্ত উৎসব আয়োজনের লক্ষ্যে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।
প্রতিবছর লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সমবেত হন দেশ-বিদেশের লাখো বাউল, সাধক ও লালনভক্ত। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনে লালনসংগীত, সাধুসঙ্গ ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তবে দীর্ঘদিন ধরে লালনমেলার সঙ্গে মাদক সেবনের অভিযোগ জড়িয়ে থাকায় এবার উৎসবকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
পুলিশ জানায়, গত রোববার থেকে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযান বৃহস্পতিবারও অব্যাহত ছিল। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসন ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রায় ২০০ পুলিশ সদস্য অভিযান চালান। এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার দুপুরে মেলার মাঠ থেকে প্রায় দুই হাজার গাঁজা সেবনের কলকে জব্দ করা হয়। উদ্ধার করা এসব কলকে ধ্বংস করা হবে বলে জানিয়েছেন কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন।
ছেঁউড়িয়া এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের অনেক মানুষের ধারণা, লালনমেলা মানেই মাদকের আড্ডা। তাঁর অভিযোগ, প্রতিবছর আলোচনা মঞ্চের আশপাশে রাতভর মাদক সেবন ও কেনাবেচা চলে। প্রশাসনের উপস্থিতিতেও এমন ঘটনা ঘটার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এবার মেলা যেন মাদকমুক্ত থাকে, সেই প্রত্যাশা তাঁর।
কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহানও মাদকমুক্ত উৎসব আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা বয়সী ভক্ত ছেঁউড়িয়ায় আসেন। তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ উন্মুক্ত মঞ্চ ও আশপাশের এলাকায় ছোট ছোট দলে বসে মাদক সেবন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় প্রকৃত বাউল সাধক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এবার প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রায় ৩০ বছর ধরে লালন আখড়াবাড়িতে আসছেন শান্ত ফকির। তিনি বলেন, গাঁজার সঙ্গে ফকির লালন সাঁইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃত সাধু-ভক্তরা মাদক সেবনের সঙ্গে যুক্ত নন। তিনিও চান, লালন উৎসব মাদকমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হোক।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, এবার লালন উৎসব মাদকমুক্ত করতে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার প্রায় দুই হাজার গাঁজা সেবনের কলকে জব্দ করা হয়েছে। মাদক প্রতিরোধে প্রতিদিনই এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, মাদকমুক্ত লালন উৎসব আয়োজন করতে পুলিশ ও প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
লালন সাঁইয়ের দর্শন, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ঘিরে আয়োজিত এই উৎসবকে মাদকের প্রভাবমুক্ত রাখাই এখন সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য। প্রশাসনের চলমান অভিযান শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর নির্ভর করবে এবারের লালন উৎসবের পরিবেশ।
