শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির ৩৪২ বছরের পুরোনো ঠাকুর দালানEi Samay
Published on
:
2 min read
মউলি মিশ্র, হাওড়া
যে কোনও বনেদি বাড়ির পুজো মানেই একটা পরিবারের সুপ্ত ইতিহাস। যার মধ্যে মিলেমিশে থাকে কিছু সত্যিকারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, অনেকটা ভক্তি আর কোনও না কোনও কিংবদন্তি। পূর্বজদের 'স্বপ্নকথা' পরম বিশ্বাসে আঁকড়ে, পুজো পরম্পরা বাঁচিয়ে রাখে উত্তরপুরুষ। এখানেই প্রতিটি বাড়ির পুজোর ইতিকথা আলাদা, একে অন্যের থেকে। হাওড়ার যে ক'টি পুজো আজও তাদের বনেদিয়ানা বজায় রেখে শতকের পর শতক ধরে চলে আসছে, তাদের একটি হলো শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো। এ বছর ৩৪২ বছরে পা রাখছে এই দুর্গাপুজো। রায়চৌধুরীরা আসলে মুখোপাধ্যায় পদবিধারী।
দিল্লির সিংহাসনে যখন মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব, বাংলার নবাব তখন মুর্শিদকুলি খাঁ। তাঁর দেওয়া উপাধি পেয়েই মুখোপাধ্যায় বংশ রায়চৌধুরী হয়। এই পরিবার আগাগোড়া চণ্ডীর উপাসক। তাহলে দুর্গাপুজোর প্রচলন এল কী করে? সে এক রূপকথা যেন। পরিবারের পূর্বপুরুষ রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরী হাওড়ার বেশ কয়েকটি গ্রামের মালিকানা পান। এখনকার শিবপুরও তারই মধ্যে একটি ছিল। তা, রামব্রহ্মের ছোট্ট কন্যাটি প্রতি দিন রাজবাড়ির কাছাকাছি বালি পুকুরে খেলতে যেত। শিবপুরের বর্তমান বাড়িটিতেই বসবাস করতেন রামব্রহ্ম রায়চৌধুরী।
একদিন বাবা মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, 'মা, তুমি কার সঙ্গে প্রতি দিন খেলতে যাও? তোমার সই কে?' মেয়ে জানায়, তার বন্ধুর নাম পদ্মাবতী। রাজার কৌতূহল বাড়ে। তিনি তাঁর চেনা, ঘনিষ্ঠ সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু তাঁদের কারওরই পদ্মা নামের কোনও কন্যা নেই, ওই নামের কোনও শিশুকন্যাকে চেনেনও না তাঁরা। রাজা মেয়েকে দিয়ে বলে পাঠালেন, একদিন বন্ধুকে বাড়ি নিয়ে আসতে। পদ্মা রাজকন্যাকে সাফ জানিয়ে দিল, সে কারও ডাকে কারও বাড়ি যায় না। যেখানে যেতে তার ইচ্ছে হয়, সেখানেই যায়। মেয়ের মুখে পদ্মাবতীর এই জবাব শুনে রাজা একইসঙ্গে বিস্মিত, ক্রুদ্ধ। একদিন রাজা নিজেই গেলেন মেয়ের সঙ্গে পুকুর পাড়ে, মেয়ের সইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে অবশ্য কারও দেখা মিলল না। শুধু দেখা গেল, আলতা পরা পায়ের ছাপ পুকুরের জল পর্যন্ত গিয়ে মিলিয়ে গিয়েছে। মেয়েকে রাজা বলে দিলেন, পদ্মাবতীর সঙ্গে আর না মিশতে। সেই রাতেই রাজা স্বপ্ন দেখলেন, পদ্মাবতী এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর সামনে। রাজাকে নির্দেশ দিলেন, 'আমার পুজো করো।'
রাজা বললেন, 'কিন্তু আমাদের পরিবারের নিত্যদেবী তো বেতাইচণ্ডী। তাঁকে ছাড়া আমরা অন্য কারও পুজো কী করে করব?' পদ্মাবতী আশ্বস্ত করলেন, তিনিই দুর্গা, তিনিই চণ্ডী। দেবীর কথামতো সেই থেকে রায়চৌধুরী পরিবারে দুর্গাপুজোর শুরু। সালটা ১৬৮৫।
দুর্গাপুজোর নবমীর একমাস আগের নবমী তিথিতে পরিবারে বোধন বসে। কাঠামোর উপরে দু'বার মাটি পড়ে যায়। সেদিন থেকেই পুজোর দালান সংলগ্ন বেলঘরে মা চণ্ডীর পুজো শুরু হয়। তাই প্রতিমার সামনে কোনও ঘট থাকে না। থাকে বেল ঘরেই। ওখানে মূল পুজো সম্পন্ন করেই বাইরে পুজো করা হয়। একইসঙ্গে পুজো যায় বেত্রচণ্ডিকা বা বেতাইচণ্ডীর কাছেও। সেই সঙ্গে পুজো উৎসর্গ করা হয় মা কালীকেও। দশমীর দিন বিসর্জনের সময়ে ডাকের সাজের মুকুটটি খুলে নিয়ে বেতাইচন্ডীর মন্দিরে চণ্ডীকে পরিয়ে দেওয়া হয়। চণ্ডীর মাথা থেকে খুলে নেওয়া হয় আগের বছরের মুকুটটি, যেটি দুর্গাপুজোর পরে কালীপুজোর সময়ে রাতের অন্ধকারে প্রতিমার সঙ্গে বিসর্জনে যায়। এই এক অদ্ভুত নিয়মে ভারসাম্য রাখা হয়, দেবী চন্ডী, দুর্গা ও কালীর মধ্যে। কেউই বঞ্চিত হন না রায়চৌধুরীদের ভক্তি এবং পুজো থেকে।
সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিন দিনই দেবীকে ছাগবলি দেওয়া হয়। সরায় করে এক খণ্ড মাংস এবং রক্ত দেবীকে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। দশমীর দিন দুর্গাকে পান্তাভাত খাইয়ে বিদায় জানানো হয়। পরিবারের প্রবীণ সদস্য অরুণ রায়চৌধুরী বলছিলেন, 'পরিবারের অনেকেই এখন আর এই পুরোনো বাড়িতে থাকেন না বটে, তবে পুজোর সময়ে সবাই এসে হাজির হন। পদ্মা বলেছিল, সে নিজের ইচ্ছেতে আসবে, যদি যথেষ্ট ভক্তভরে তার পুজো করা হয়। পুজোর যে শর্ত পদ্মাবতী বেঁধে দিয়েছিলেন, সেটাই পালনের চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা।'