কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের হিসাব নেই রেজিস্ট্রারে, ওয়ার্কারস প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) বিতরণ করেনি। শুধু তাই নয় বাজারে কোম্পানিটি প্রতিদিন কত টাকার পণ্য বিক্রি করছে নিরীক্ষককে লেজারে বা মেমোতে তার হিসাব দেখাতে পারেনি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বঙ্গজ লিমিটেড। এছাড়া কর প্রদান করার সমপরিমাণ অর্থের নথি নিরীক্ষককে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জানা গেছে, কোম্পানিটি যথাযথভাবে স্থায়ী সম্পদের হিসাব রেজিষ্ট্রারে সংরক্ষণ না করায় স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব শনাক্ত করা, সম্পদের অবস্থান, অবচয় মূল্য এবং কোম্পানির কত টাকার জমি, সম্পদ বা যন্ত্রপাতি আছে তা যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক।
তবে বঙ্গজ কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষককে জানায়, ২০১৩ সালে কোম্পানিটি স্থায়ী সম্পদের পুনঃমূল্যায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গজের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ওই পুনঃমূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং সহায়ক নথিপত্র দিতে পারেনি। ফলে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক বিবরণীতে পুনঃমূল্যায়নের পরিমাণ হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করে যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক। আলোচ্য সময়ের আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষায় এসব বিষয় তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক।
বঙ্গজ লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ৩০ জুন বঙ্গজ লিমিটেড তাদের গ্রাহক ও অন্যান্য পক্ষের কাছে পাওনার পরিমাণ ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। আগের বছর একই সময়ে পাওনা ছিল ৭ কোটি ৯২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে পাওনার পরিমাণ বেড়েছে ৪৭ লাখ ২১ হাজার ৬৯ টাকা। তবে এসব পাওনার অস্তিত্ব ও আদায়যোগ্যতা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নথিপত্র পায়নি নিরীক্ষক।
এদিকে, সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানির অগ্রিম জমা ও অগ্রিম পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। কিন্তু এই অর্থের ব্যবস্থাপনা চুক্তি, চালান, অর্থ পরিশোধের সমর্থনে কোনা রেকর্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি দিতে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। ফলে এই হিসাব যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক।
দেশের শ্রম আইন,২০০৬ এর সেকশন ২৩৪ অনুযায়ী, লাভজনক কোম্পানিগুলোকে তাদের বাৎসরিক নিট মুনাফার ৫ শতাংশ টাকা ‘শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল' বা ডব্লিউপিপিএফ এ জমা করতে হয়। তা কর্মীদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। বঙ্গজ লিমিটেড কাগজে-কলমে এই তহবিলের কথা উল্লেখ করলেও, বাস্তবে শ্রমিকদের কোনো টাকা বিতরণ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
কর পরিশোধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। কোম্পানিটি দাবি করেছে যে, সমাপ্ত হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি আয়কর দিয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষক চালান বা রসিদ চাইলে মাত্র ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকার প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। বাকি প্রায় ১০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা কোথায় বা কীভাবে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক।
এছাড়া আয়কর আইন মেনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়ার কথা থাকলেও বেতন নগদে পরিশোধ করছে বঙ্গজ।
কোম্পানির পরিচালনায় সরকারি ও পুঁজিবাজারের বিধিবিধানও মানছে না বঙ্গজ। ২০২০ সালে দেশের কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ সংশোধনের মাধ্যমে সব পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির নামের শেষে "পিএলসি’ লেখা বাধ্যতামূলক করা হলেও বঙ্গজ লিমিটেড এখনো তা করেনি। এছাড়া যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের (আরজেএসসি) দপ্তরে বার্ষিক রিপোর্ট জমা না দেওয়া, প্রতি বছরের নির্ধারিত সময়ে ক্রেডিট রেটিং না করানো এবং পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ না করার মতো বিধিবিধান মানছে বলে জানায় নিরীক্ষক।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। কোম্পানি দাবি করেছিল যে, তাদের কোনো সাথে সম্পর্ক রয়েছে বা সিস্টার কনসার্নের সাথে আর্থিক লেনদেন হয়নি। কিন্তু নিরীক্ষায় দেখা যায়, বঙ্গজ লিমিটেড তাল্লু গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের আর্থিক লেনদেন করেছে।
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের আর্থিক অব্যবস্থাপনা এবং বিধিবিধান না মানার প্রবণতা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব বিষয়ে জানতে বঙ্গজ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব জিন্নাত আলী মৃধাকে একাধিকবার ফোন করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে অফিসের নাম্বারে ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, বছরের ব্যবধানে পণ্য বিক্রিও কমেছে বঙ্গজ লিমিটেডের। ৩০ জুন, ২০২৬ সালের সমাপ্ত হিসাব বছরে বঙ্গজ লিমিটেডের মোট বিক্রি হয়েছে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, যা আগের বছর একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি ৭৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
বঙ্গজ লিমিটেড দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১৯৮৪ সালে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। কোম্পানিটি বর্তমানে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে।
