লন্ডন থেকে এম. হাসানুল হক উজ্জ্বল: যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে কাজ ও অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে ব্রিটিশ হোম অফিস। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশজুড়ে ৭ হাজার ২৭০টি অভিযানে ৪ হাজার ৭৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়েছে ২০ শতাংশ। হোম অফিসের প্রকাশিত পরিসংখ্যান ঘিরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তবে পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যাম কাউন্সিলের একটি সিদ্ধান্ত অভিবাসন অভিযান নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ৫ অক্টোবর কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ সভায় একটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলে হোম অফিসের অভিবাসন অভিযানে কাউন্সিলের কর্মী, ভবন, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার না করার অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত হোম অফিসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অবৈধ কর্মসংস্থানবিরোধী অভিযান ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে মোট কতজন গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ছয় মাসে ৭ হাজারের বেশি অভিযান: হোম অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যজুড়ে ৭ হাজার ২৭০টি অবৈধ কর্মসংস্থানবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় ৪ হাজার ৭৫৬ জনকে।
২০২৫ সালের একই সময়ে ৫ হাজার ৫৫৪টি অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৩ হাজার ৯৬৯ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে অভিযানের সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৭১৬টি এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়েছে ৭৮৭ জন। শতকরা হিসাবে অভিযান বেড়েছে ৩১ শতাংশ এবং গ্রেপ্তার বেড়েছে ২০ শতাংশ। হোম অফিসের হিসাবে, অবৈধভাবে কাজের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ ছিল রেকর্ডভিত্তিক সবচেয়ে সফল প্রথমার্ধ।
রেস্তোরাঁ, বিউটি পারলার ও নির্মাণ খাতে বেশি অভিযান: অবৈধ কর্মসংস্থানবিরোধী অভিযানে রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে ও ক্যাফে খাত উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যবস্তু ছিল। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে ২ হাজার ১৯৫টি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে ১ হাজার ৫৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অভিযানের সংখ্যা বেড়েছে ৩১ শতাংশ।
নেইল বার, ট্যানিং সেলুন ও নাপিতের দোকানসহ বিউটি খাতে ১ হাজার ৪১টি অভিযান পরিচালনা করে ৬৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ খাতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৫৪ শতাংশ।
গুদামজাতকরণ, পণ্য বিতরণ ও ডেলিভারি পরিষেবা খাতে ৬৩৫টি অভিযানে ৬৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ খাতে অভিযানের সংখ্যা বেড়েছে ১৪৭ শতাংশ এবং গ্রেপ্তার বেড়েছে ৭০ শতাংশ। নির্মাণ খাতেও অভিযান উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ খাতে ২৬৮টি অভিযান চালানো হয় এবং ৩৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগের বছরের তুলনায় অভিযানের সংখ্যা বেড়েছে ১৫০ শতাংশ।
গ্রেপ্তারে শীর্ষে লন্ডন: অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে ইংল্যান্ডে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ৬ হাজার ১২৪টি অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় ৪ হাজার ১৪৩ জনকে।
ইংল্যান্ডের অঞ্চলগুলোর মধ্যে লন্ডনে সবচেয়ে বেশি অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীতে ১ হাজার ৮১৪টি অভিযানে ১ হাজার ২৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় লন্ডনে অভিযান বেড়েছে ৪৪ শতাংশ এবং গ্রেপ্তার বেড়েছে ৩২ শতাংশ।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ৮৯৫টি অভিযানে ৬৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে ৮৮৪টি অভিযানে গ্রেপ্তার হন ৭০১ জন।
অন্যদিকে, উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে ২১৬টি অভিযানে ৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ অঞ্চলে অভিযান কমেছে ২ শতাংশ এবং গ্রেপ্তার কমেছে ২০ শতাংশ। স্কটল্যান্ডে গ্রেপ্তার কমেছে ৫ শতাংশ এবং ওয়েলসে ২ শতাংশ।
নিয়োগদাতাদের জরিমানা ৭৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি: হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগের অভিযোগে ১ হাজার ২০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এসব জরিমানার মোট পরিমাণ ৭৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। এ সময় ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ধের নোটিশও জারি করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, কর্মী নিয়োগের আগে তাঁদের কাজ করার বৈধ অধিকার যাচাই করা নিয়োগদাতাদের দায়িত্ব। যথাযথ যাচাই না করলে নিয়োগদাতাদের আর্থিক জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে।
অভিবাসন আটককেন্দ্রে দুই হাজারের বেশি মানুষ: হোম অফিসের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের শেষে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন আইনের আওতায় আটক ছিলেন ২ হাজার ১৫২ জন। ২০২৫ সালের ৩০ জুনের তুলনায় এ সংখ্যা ১৯ শতাংশ বেশি। জুন ২০১৮-এর পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মোট ২২ হাজার ৩৭ জন অভিবাসন আটকপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছেন। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ২ শতাংশ বেশি।
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দুই বছরে অবৈধ কর্মসংস্থান বিরোধী অভিযানে ১৭ হাজার ১১৪টি গ্রেপ্তারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের দুই বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ১২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ৭৯৩টি।
তবে অবৈধভাবে কাজের অভিযোগে গ্রেপ্তার, অভিবাসন আটককেন্দ্রে আটক ব্যক্তির সংখ্যা, আশ্রয়প্রার্থী এবং অনিয়মিত অভিবাসীর মোট সংখ্যা এক নয়। এসব পরিসংখ্যান আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
