গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। গোষ্ঠীস্বার্থে গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্প বাতিল অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে অবিলম্বে বিআরটি চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়।
অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়া, এক যুগের বেশি জন ভোগান্তি এবং ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয়ের পর প্রকল্পটি বাতিলের পরিবর্তে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করা ছিল অধিকতর যৌক্তিক, পরিকল্পনাগতভাবে ফলপ্রসূ, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও জনস্বার্থসম্মত সিদ্ধান্ত। প্রাইভেট বাস মালিক ও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, টেকসই পরিবহন পরিকল্পনা এবং গণপরিবহনবান্ধব নগরায়ণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিআরটি অবিলম্বে চালু করতে পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ সাপেক্ষে পরিকল্পনাবিদদের দাবি এবং গাজীপুরবাসীর চাহিদাকে উপেক্ষা করে গোষ্ঠীস্বার্থে বিআরটি প্রকল্প বাতিল সরকারের গণপরিবহনভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলবার অঙ্গীকারকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বলে মনে করে আইপিডি।
আইপিডি বিশ্বাস করে, বর্তমান সরকার একদিকে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিংয়ের মাধ্যমে ঢাকায় বাসভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় সম্পন্ন একটি বিআরটি প্রকল্প বাতিল করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে— সরকারের এই দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে সুস্পষ্ট নীতিগত বৈপরীত্য রয়েছে। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। অথচ আর এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে বিআরটি প্রকল্প চালু করা যেত, যা মেট্রোরেল এর চেয়ে অনেকটাই সাশ্রয়ী । ফলে একই সময়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের চাইতে তুলনামূলকভাবে কম বিনিয়োগে চালু করা সম্ভব হতে পারে এমন একটি বিদ্যমান গণপরিবহন প্রকল্প বাতিলের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।
এটা বিস্ময়ের বিষয় যে, সরকারের আমলা ও নীতিনির্ধারকরা পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল ধ্বংস করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটা র্যাম্প বাতিল করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব চুক্তির দোহাই দিয়ে পরিবেশকর্মী, পেশাজীবী ও নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদের প্রতি কর্ণপাতে করেনি। অথচ সরকারের কাছে গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্প পুরোপুরি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি যৌথ অর্থায়নের বিষয়টি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এতে প্রমাণ হয়, রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত প্রকল্প সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কতিপয় আমলা ও স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশ ও আঁতাতই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সামগ্রিক জনস্বার্থ কিংবা পরিকল্পনা ও পরিবেশগত বিষয়গুলো এখানে গোষ্ঠীস্বার্থে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। একটি ক্ষেত্রে চুক্তি ও প্রকল্পের ধারাবাহিকতার যুক্তি দেখিয়ে পরিকল্পনাগত এবং পরিবেশগত উদ্বেগ সত্ত্বেও নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, অন্য ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় সম্পন্ন গণপরিবহন অবকাঠামো বাতিল করা হচ্ছে। এই বৈপরীত্যে সুস্পষ্টভাবে অগ্রহণযোগ্য।
আইপিডি মনে করে, গত প্রায় এক দশক ধরে বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে গাজীপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষ যে সীমাহীন যানজট, যাতায়াতে দুর্ভোগ, সময়ের অপচয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত তাদের সেই দীর্ঘ ভোগান্তিকে অর্থহীন করে তুলবে। ফলে গাজীপুর থেকে ঢাকায় প্রতিদিন যাতায়াতকারী বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রকল্পটি বাতিল করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিআরটি প্রকল্পের নকশা, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় যেসব ত্রুটি ও ব্যর্থতা রয়েছে, সেগুলো নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারি অর্থের অপচয়, দীর্ঘসূত্রতা ও জনদুর্ভোগের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে গিয়ে প্রকল্পটিই বাতিল করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অপচয় নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে বলে মনে করে আইপিডি।
বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান বাস পরিচালনা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঝুঁকি এবং গণপরিবহনের জন্য নির্ধারিত অবকাঠামো বাতিলের সম্ভাব্য প্রভাব সার্বিক জনস্বার্থ ও জনকল্যাণকে ব্যাহত করবে ।
এএসএস/আরএফ
