মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার

সোহান আহমেদ ৫০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন। এর সঙ্গে তাঁকে হাসিল বাবদ আরও আড়াই হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর পশুর হাটে গরু কিনে এমন বাড়তি খরচের মুখে পড়েন তিনি।
শুধু শমশেরনগর হাটেই নয়, জেলার সব পশুর হাটে গরু-মহিষ কেনাবেচায় প্রতি হাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, অর্থাৎ লাখে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হাসিল আদায় করা হচ্ছে। এতে চাপে পড়ছেন ক্রেতা-বিক্রেতা—দুজনই। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত হার সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকা এবং প্রশাসনের তদারকির অভাবে ইজারাদারেরা অতিরিক্ত হাসিল আদায় করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ব্রাহ্মণবাজার, টেংরা, আদমপুর, মুন্সীবাজার, ভৈরববাজার ও দিঘিরপাড়সহ জুড়ী, বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন পশুর হাটে একই হারে হাসিল আদায় করা হচ্ছে। ক্রেতাদের ভাষ্য, পশুর দাম পরিশোধের পর হাসিল বাবদ বড় অঙ্কের টাকা দিতে গিয়ে তাঁদের নির্ধারিত বাজেট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, এই বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে দরদামেও। ক্রেতাকে হাসিলের টাকা জোগাতে গিয়ে অনেক সময় বিক্রেতার কাছ থেকে কম দামে পশু কেনার চেষ্টা করছেন। এতে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে বিপাকে পড়ছেন বিক্রেতারাও।
শমশেরনগর বাজার থেকে ২৪ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন আলতাফুর রহমান। তাঁকে হাসিল দিতে হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। আলতাফুর বলেন, প্রতি হাজারে ৫০ টাকা হিসাবে হাসিল নেওয়া হয়েছে। এতে আমার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হলো।
কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার পশুর হাটে দেড় লাখ টাকায় একটি মহিষ কেনেন আনোয়ার মিয়া। তাঁর অভিযোগ, মহিষটির জন্য তাঁকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা হাসিল দিতে হয়েছে। তাঁর দাবি, হাটে অন্য ক্রেতাদের কাছ থেকেও একই হারে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
পশু বিক্রেতারা বলছেন, বাড়তি হাসিলের কারণে তাঁরা অনেক সময় প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না। একজন ক্রেতাকে এক লাখ টাকার গরু কিনে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা হাসিল দিতে হলে সেই বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ে পশুর দামে। ফলে ক্রেতারা বাজেটের মধ্যে থাকতে গরুর দাম কমানোর চেষ্টা করেন। এতে শেষ পর্যন্ত লোকসানের মুখে পড়তে হয় বিক্রেতাদের। তাঁদের দাবি, পশুর হাটে প্রতি হাজারে হাসিল ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হোক।
তবে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিভিন্ন হাটের ইজারাদাররা। তাঁদের দাবি, আগের তুলনায় বাজারের ইজারামূল্য কয়েক গুণ বেড়েছে। জেলার বেশির ভাগ হাটের ইজারামূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই ব্যয় সামাল দিতেই প্রতি হাজারে ৫০ টাকা হাসিল নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এ হার বেশি নয় বলেও দাবি তাঁদের।
হাসিল আদায়ের হার নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, আমার জানা মতে পশুর হাটে ৫ শতাংশ হারে হাসিল আদায় করা হয়। কোনো ইজারাদার এর বেশি আদায় করলে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমলগঞ্জের ইউএনও সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে অনেকে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলার বাজার ইজারাদারদের সঙ্গে বসব। সম্প্রতি যোগ দেওয়ায় এ বিষয়ে এখনো বৈঠক করা হয়নি। সরকারি তালিকা ও বাজারের ইজারামূল্য পর্যালোচনা করে হাসিলের হার নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোছা. শাহিনা আক্তার বলেন, পশুর হাটের এসব বিষয় স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তদারকি করেন। সরকারি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারের ইজারামূল্যের ভিত্তিতে হাসিল আদায়ের হার নির্ধারণ করা হয় বলেও জানান তিনি।
মৌলভীবাজারের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রুবেল মাহমুদ বলেন, প্রতিটি উপজেলায় হাসিল আদায়ের নির্ধারিত তালিকা রয়েছে। সে অনুযায়ী টাকা নেওয়ার কথা। কোনো হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ পেলে আগের ইজারামূল্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, আগের তুলনায় এখন বেশি দামে বাজার ইজারা দেওয়া হচ্ছে।
