তুলনামূলক ভালো মুনাফা ও নিরাপদ বিনিয়োগের প্রত্যাশায় ফের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ৪০৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই মাসে নিট বিক্রি হয়েছিল ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে নিট বিক্রি বেড়েছে ১২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ সুদ-আসল পরিশোধের চেয়ে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বেশি ছিল।
ফলে জুলাই ও আগস্টÑ এ দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিট বিক্রি ছিল ১ হাজার ৫৭২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে ৮৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবে এর আগে গত জুনে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল নেতিবাচক। ওই মাসে বিক্রির তুলনায় আগের আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ ৩৬৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বেশি ছিল। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার পেছনে শুধু মুনাফার হার নয়, ব্যাংক খাত নিয়ে আমানতকারীদের উদ্বেগও ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি সঞ্চয়কারীদের একটি অংশ ব্যাংকে টাকা রাখার পরিবর্তে সরকার সমর্থিত সঞ্চয়পত্রকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে বিদ্যমান মুনাফার হারকে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চলতি জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য সঞ্চয়পত্রের বর্তমান মুনাফার হার বহাল রেখেছে সরকার। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যাংকের আমানতের তুলনায় এই হার অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় হওয়ায় সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। জুলাই শেষে এই স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর গত জুন শেষে সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকারের ঋণস্থিতি ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সাধারণত ব্যাংক-ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়।
ওই অর্থবছরে মোট ৯২ হাজার ৬১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর বিপরীতে সুদ ও আসল বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু মুনাফা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ পরপর দুই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো নিট ঋণ নিতে পারেনি সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়।