‘এই মোম জোছনায়ʼ থেকে ‘জলে নেবো নাʼ। ‘লজ্জাʼ থেকে ‘বন্য বন্য এ অরণ্যʼ। আজও আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ছাড়া পুজো মণ্ডপের গান যেন অসম্পূর্ণ। কিন্তু কলকাতা শহর যখন মেতে উঠেছে শারদোৎসবে তখন মুম্বইতে বসে কী ভাবে পুজো কাটালেন আরতি? আনন্দ উৎসবের বিজয়া আড্ডায় মুম্বই থেকে ধরা দিলেন কিংবদন্তি গায়িকা আরতি মুখোপাধ্যায়।
প্রশ্ন: কলকাতার পুজোকে মিস করেন?
আরতি: কলকাতাকে মিস করি বটেই। আমাদের তো আগে হিন্দুস্তান পার্কে বাড়ি ছিল। বাড়ির সামনেই দুর্গাপুজো হত। সারা দিন ঢাক বাজছে, মাইকে গান বাজছে। কোথাও বেরতে হত না। বাড়ির উঠোনে মাদুর বিছিয়ে বসে থাকলেই মায়ের মুখ দেখা যেত, পুজোর আমেজ উপভোগ করা যেত। এখন মুম্বইয়ে আমার বাড়ির কাছে খারে রামকৃষ্ণ মিশনে পুজো হয়। সেখানে পারলে যাই। তবে মুম্বইয়ের পুজোয় এখন আর খুব একটা বেরনো হয় না। এখন মনে হয় পুজো এলে নিজের শরীর যেন খারাপ না হয়। আগেকার বম্বেতে শক্তি সামন্তর পুজোয় গান গাইতে কলকাতা থেকে এসেছি অনেক বারই। আরও অনেক জায়গাতেই। কলকাতায় পুরনো দিনের পুজোর কথা ভেবে নস্টালজিক লাগে। কষ্টও হয়।
প্রশ্ন: কীসের কষ্ট?
আরতি: নয়ের দশক থেকে তো পুজোর গান ব্যাপারটাই শেষ হয়ে গেল। এ কষ্ট যে কী কষ্ট, বলে বোঝাতে পারব না। ছয়-সাতের দশকে পুজোর বাংলা গান কোন শিল্পী কোনটা গাইলেন, সেটা নিয়ে মানুষের মনে একটা উন্মাদনা ছিল। আমরাও তো হেমন্তদা, সন্ধ্যাদি, মান্নাদা, লতাজি, আশাজি পুজোয় নতুন কী গান গাইছেন শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে থাকতাম।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম পুজোর গান কোনটা ছিল?
আরতি: আমার প্রথম পুজোর গান ছিল 'চিনেছি চিনেছি তোমার এ মনʼ। সুধীন দাশগুপ্তের কথায় ও সুরে। ঘরে ঘরে সেই গান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তার পরে তো প্রতি বছর পুজোর গান গাইতে হতই। ‘এই মোম জোছনায়ʼ, ‘ওগো মনের দুয়ারেʼ, ‘লজ্জা লজ্জাʼ, ‘না বলে এসেছিʼ, ‘তখন তোমার একুশ বছরʼ— আমার বেশির ভাগ আধুনিক গান পুজোর সময়কারই রিলিজ। এমনকি শ্রোতাদের আমার উপরে একটা অধিকারবোধ ছিল। তাঁরা বলতেন, আরতি মুখার্জির গান হিট হতেই হবে।
প্রশ্ন: ‘ফুলঝুরি থেকে ফুল ঝরে গেলে,মালা কিসে গাঁথা হয়? তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়ʼ...আরতির এই সিগনেচার পুজোর গান কেমন ভাবে তৈরি হয়েছিল?
আরতি: গানটার শুরুর সুরটা শুনেই আজও শ্রোতারা বলে দেন কী গান! তাই না? এখন এমন গান কই? সেটাই খারাপ লাগে। বম্বের এইচএমভি কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার আমাকে বললেন— আরতি কলকাতা থেকে ফোন আসছে তোমার পুজোর গানের জন্য। ঠিক তখনই ওখানে বাপ্পি লাহিড়ী ঢুকেছেন। সব শুনে বাপ্পিও রাজি। অসম্ভব ভাল সুর করল বাপ্পি। আর গানের কথা লিখলেন সুবীর হাজরা। ‘তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়, আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়ʼ এই কথা তো যুগে যুগে প্রেমের কথা। যার জন্য গানটা আজও সমকালীন। গানটা খুব কঠিন কিন্তু। গলাটা ওই চড়ায় লাগানো খুব সহজ কথা নয়। রেকর্ডের উল্টো পিঠে ছিল বাপ্পির সুরেই ‘তোমার ঘরের পুতুলগুলো আমার চেয়ে দামিʼ। তবে খারাপ লাগে ‘তখন তোমার একুশ বছরʼ এত বড় হিট হওয়ার পরেও বাপ্পি আর আমাকে দিয়ে পুজোর গান গাওয়ালো না। হয়তো ইচ্ছে থাকলেও পারেনি। কেন, সে উত্তর নেই।
প্রশ্ন: সুধীন দাশগুপ্তের পরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর নচিকেতা ঘোষ তো আপনাকে দিয়ে অনেক পুজোর গান গাইয়েছিলেন?
আরতি: হ্যাঁ, শুধু তাই নয়। হেমন্তদা আমাকে ছায়াছবির গানেও অনেক সুযোগ দিয়েছেন। আর নচিদার সুরে আমার পুজোর গান মাইলফলক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আরও দুই কিংবদন্তি সুরকার কখনও আমার জন্য পুজোর গান বানালেন না!
প্রশ্ন: কারা সেই দুʼজন সুরকার?
আরতি: প্রথম জন সলিল চৌধুরী। সলিলদা আমায় বলেছিলেন— আরতি তোমার জন্য পুজোর গান করছি। তার পরে আর ডাকেননি। আমি ছ’মাস ধরে সলিলদাকে ফোন করে অনুরোধ করে গিয়েছি, যেটা সচরাচর কারও ক্ষেত্রে করিনি। কিন্তু সলিল চৌধুরী আমায় দিয়ে একটাও পুজোর গান গাওয়াননি। কেন যে আশা দিয়েছিলেন!
আর এক জন পঞ্চমদা। একই গল্প রাহুল দেব বর্মণের ক্ষেত্রেও। পঞ্চমদা বললেন— আরতি, তোর জন্য পুজোর গান করব। কিন্তু করে উঠতে পারেননি। অথচ আমার যাতে ভাল হয়, সেটা পঞ্চমদা সব সময়ে বলতেন। ‘দো নয়না অউর এক কহানিʼ রেকর্ড করার পরে আমায় পঞ্চমদা বলেছিলেন— আরতি তোর এ গান হিন্দিতে সিগনেচার গান হবে। তাই হল। ফিল্মফেয়ার পেলাম। অথচ সেই মানুষটা আমার জন্য পুজোর বাংলা গান করলেন না। অবাক লাগে। এইচএমভি থেকে কত জন ফোন করে ওঁকে বলেছেন, তবু আমার জন্য ডাক আসেনি। আজও জানি না কথা দিয়েও সলিলদা, পঞ্চমদা কেন কথা রাখলেন না?
প্রশ্ন: আর ডি বর্মণ তো সব পুজোর বাংলা গান আশা ভোঁসলেকে দিয়েই গাওয়াতেন। আশাজির চাপেই কি আপনি আর ডি-র থেকে ডাক পেলেন না?
আরতি: জানি না। পঞ্চমদা-আশাজির বাড়ির পুজোয় যখন গিয়েছি, আশাজি নিজে আমাদের ভোগ বেড়ে দিতেন। পঞ্চমদা প্লেব্যাকে তো আমায় নিয়েছেন, কিন্তু পুজোর গানে আমি বাদ। কারণটা যে কী!
প্রশ্ন: আপনার শেষ পুজোর গান কি ছিল?
আরতি: ভাল গান লেখার গীতিকার-সুরকার তো কমে যেতে থাকল। শেষের দিকে কী গেয়েছি, আর মনে পড়ে না। যতদূর মনে পড়ছে রবীন্দ্র জৈনের সুরে ‘পথ ছাড়ো ছাড়ো দেরি যে হয়ে যায়ʼ।
প্রশ্ন: বাঙালি নারীর কাছে সাদা ঢাকাই শাড়ির আইকন তো আজও আরতি মুখোপাধ্যায়?
আরতি: গান গাইব মানে আমার পোশাকের আভিজাত্যও তো মানুষ দেখবেন। সাদা ঢাকাই খুব সচেতন ভাবেই পরতাম, পরি চিরকাল। প্রিয় বলেই আমার স্টাইল স্টেটমেন্ট হয়ে গেল। আমাদের গান করা, শাড়ি পরা, আড্ডা দেওয়া একটা মজা ছিল। খুব আনন্দে দিনগুলো কাটিয়েছি। পুজোর গান থেকে পুজোর আড্ডা, এখন সবই গল্পকথা মনে হয়। আর কি বাঙালি শ্রোতারা পুজোর গান পাবেন?
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।
