সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি রিয়াদের বিরুদ্ধে এবার ব্যাপক সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক প্রচারযুদ্ধে নেমেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সৌদি নেতৃত্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে তারা মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের নথিগুলোকে প্রধান প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে ২০১৯ সালে মারা যাওয়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারকারী এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে সৌদি রাজপরিবার-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ পাঠিয়েছিলেন বলে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে হুতিদের গণমাধ্যম শাখা। মক্কার ওপর ড্রোন হামলার সৌদি অভিযোগের জবাবে হুতি প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত পাল্টা অভিযোগ তুলে দাবি করেন, যাঁরা এপস্টিনের মতো ব্যক্তিকে কাবার পবিত্র গিলাফ উপহার দেন, তারাই মূলত পবিত্র মক্কার মর্যাদাহানি করছেন। তবে এ অভিযোগ নিয়ে সৌদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হুতিদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে এই বার্তাটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারী থাকা ইয়েমেনি কৌতুক অভিনেতা মোস্তফা আল-মুমরসহ দেশটির শিল্পীরা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিশানা করে গান, ব্যঙ্গাত্মক নাটক ও বিশ্লেষণমূলক ভিডিও তৈরি করে অন্তর্জালে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
হুতিদের নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক বক্তব্যেও বারবার জেফরি এপস্টিনের নাম টেনে আনা হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি তাঁর ভাষণে পশ্চিমা বিশ্ব ও সৌদি নেতৃত্বকে আক্রমণ করতে গিয়ে বলেন, ‘এপস্টিনের ফাইলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এগুলো এমন এক জায়নবাদী আঁতুড়ঘর উন্মোচন করে, যা নেতা ও অভিজাতদের গড়ে তোলে।’
ওয়াশিংটনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশার মতে, হুতিদের এই গণমাধ্যম নেটওয়ার্কটি এখন সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিগত অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে যেমন এপস্টিনকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনই ইহুদি আধিপত্য সংক্রান্ত নানা ধরনের ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠা করতেও এটিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। গবেষক মোস্তফা আয়াদ উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও সৌদি আরব যে মার্কিন স্বার্থের ‘একই শিবিরে’ অবস্থান করছে, মুসলিম বিশ্বে এই মনোভাব স্থায়ী রূপ দিতেই এমন মনস্তাত্ত্বিক পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামরিক জোটের সরাসরি সম্পৃক্ততার ফলে অঞ্চলটিতে বিশ্বের অন্যতম চরম মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অনাহার ও মহামারিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির পর গত আগস্ট থেকে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত এবং আড়াই লক্ষাধিক বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ২২ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
