তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গত আট মাসে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জনগণের আস্থা ধরে রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দমনপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উত্তারাধিকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে বৈরী পরিস্থিতির কারণে লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। এর মধ্যে দলের ভেতরে কারও কারও অনাকাঙ্ক্ষিত আচার-আচরণে সরকারকে বিব্রত অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় জনস্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ভাবমূতি রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে সরকার। দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কাজে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি এই নীতি বাস্তবায়নে দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা, দলীয় প্রভাব খাটানো
এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকার আপসহীন থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনটা অব্যাহত থাকলে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, বর্তমান সরকার মনে করে তার মূল শক্তি হলো জনগণের আস্থা। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সেই আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। অতীতে দেখা গেছে, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল, প্রভাবশালী গোষ্ঠী, এমনকি সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে কতিপয় ব্যক্তি নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে সরকারের অর্জনগুলো ঢাকা পড়ে এবং জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃতাধীন সরকারের সর্বক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মাইল ফলক হয়ে থাকবে।
তবে কঠোর অবস্থানের নীতি যত ভালোই হোক না কেন, তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা সংস্কৃতি বা ‘সিস্টেম’কে রাতারাতি পরিবর্তন করা যেমন কঠিন; তেমনি কিছু ক্ষেত্রে গোপন আঁতাত ভাঙাও সময়সাপেক্ষ— যেখানে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তাই রাজনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারকে দুদক, নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, ‘কাউকে ছাড় নয়’— এই নীতির ফলে সমাজে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রে বেশ কিছু দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হচ্ছে যে, অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না, যা সুশাসনের জন্য বড় মাইলফলক। এতে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি শাস্তির ভয়ে এবং পুরস্কারের আশায় সরকারি কর্মচারীদের কাজের গতি ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিঘ্ন ঘটলে সরকারের ভাবমূর্তি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আশার কথা; অপরাধী কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকলেও তাকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অভিযান পরিচালনার তাগিদ রয়েছে। যতদূর জানি পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ কোনো হয়রানির শিকার না হয়।
এদিকে সরকার গঠনের মাত্র আট মাসে বিএনপি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় দুইজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে একজন সংসদ সদস্যও পদত্যাগ করেছেন। এসব পদত্যাগের কোনোটিই তাদের নিজেদের ইচ্ছায় হয়নি। সবশেষ গতকাল সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এর আগে গত ২২ আগস্ট জহির উদ্দিন স্বপনকে তথ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব একরকম কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে মাঠে গুঞ্জন আছে। এরপর রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে গত ১ অক্টোবর তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলেও এর পেছনে কারণ নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা আছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে কেউ যদি মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কোনো কাজ করেন, সেটা তার যত কাছের মানুষই হোন না কেন, সে বিষয়ে তিনি যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, সেটাই নেবেন। তিনি ইতোমধ্যে সেটা প্রমাণ করেছেন। আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। সুতরাং এটা আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি মূলত রাষ্ট্রেরই ভাবমূর্তি। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কাজে ছাড় নয়— প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থান দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
বিএনপির একটি নির্ভরশীল সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের গৃহীত কঠোর বা ‘হার্ডলাইন’ অবস্থান মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সরকারের এই অনমনীয় কৌশলের মুখে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের ভাবমূর্তি বজায় রাখা অন্যদিকে নেতাকর্মীদের ওপর আইনি ও প্রশাসনিক চাপ— সব মিলিয়ে এক জটিল ও বহুমুখী চাপের মুখোমুখি দাঁড়াতে যাচ্ছে দলটি। ইতোমধ্যে সরকারের এই আপসহীন মনোভাব বিএনপির ভেতরে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। কারণ বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। এখনও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা ঝুলে রয়েছে। অনেকেই নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে দিতে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তৃণমূলের কর্মীরা আরও ভয় পাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, এই ভীতি দলের সাংগঠনিক গতিশীলতাকে অনেকাংশে মন্থর করে দিতে পারে।
বিএনপির বেশকয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা আমাদের সময়কে বলেছেন, দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। টার্গেট করে করে দলের নিবেদিত নেতাদের সাংগঠনিকভাবে মাঠ গোছানোর চেষ্টা করলেই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন হতে পারে অপপ্রচারের মাধ্যমে তা ভণ্ডুল করার চেষ্টা চলছে। মূলত জনশৃঙ্খলা বা জানমালের ক্ষতির দোহাই দিয়ে যেকোনোভাবে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে রাখার পাঁয়তারা করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া সরকারের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল কী হওয়া উচিত— তা নিয়েও দলের ভেতরেই যেন এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমাদের সময়কে বলেন, সর্বক্ষেত্রে সরকারের কঠোর অবস্থান ভবিষতে নিঃসন্দেহে বিএনপিকে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস বলে, অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান অনেক সময় উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে। তাই বিএনপি যদি এই মুহূর্তে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত হতে না পারে এবং সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষকে দূর করে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করতে না পারে, তবে সরকারের কঠোর পরিস্থিতির মোড় যে কোনো সময় ঘুরে যাওয়া অসম্ভব নয়। এমনকি বিএনপিকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজনৈতিক ব্যাকফুটে থাকতে হতে পারে। ফলে ক্ষমতাসীন দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে সরকারের সহনশীলতা ও কৌশলগত দক্ষতার ওপর।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, সংগঠনকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর যে রকম নির্দেশনা আছে; আমরা সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তবে রাজনৈতিক সহনশীলতার পাশাপাশি সরকারকে কঠোর হতে হবে। সরকার পরিচালনা শুরু হয়েছে এখন এগিয়ে যাবে; পাশাপাশি দলের রাজনীতিকেও গতিশীল করতে হবে। সরকারের ভাবমূতি ক্ষুণ্ন হয় এমন কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে ফাঁদে পড়ে যাবে দল এবং দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তাই কিছু অ্যাকশন সরাসরি নেওয়া দরকার।
