নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরীরাই যখন অরক্ষিত
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান এবং অপরাধ দমনে যারা সম্মুখভাগে থেকে লড়াই করেন, সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই যখন প্রশ্ন ওঠে
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান এবং অপরাধ দমনে যারা সম্মুখভাগে থেকে লড়াই করেন, সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন তা পুরো সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি খুলনায় ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রেক্ষাপটে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে রাতে পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর মধ্যরাতে খুলনার খানজাহান আলী রোডের খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এরপর শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপার স্বাক্ষরিত এক দাফতরিক চিঠিতে জেলার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকার পুলিশ সদস্যদের রাতে কোনোভাবেই একা চলাচল না করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই নির্দেশ জারির পর থেকেই খুলনার সচেতন মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন উঠেছে—যাঁরা সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় নিয়োজিত, তারাই যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন এবং একা চলতে না পারেন, তবে সাধারণ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? পুলিশের এই অভ্যন্তরীণ সতর্কতা বার্তা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য জরুরি মনে হলেও, এটি জনমনে এক গভীর আতঙ্ক ও আস্থার সংকটের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও শ্রমজীবীরা যাঁরা জীবিকার তাগিদে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে গভীর রাতে বা ভোরে ঘরের বাইরে যাতায়াত করেন, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে।
খুলনার পুলিশ প্রশাসনের এই কড়া নির্দেশ জারির নেপথ্যে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট ও গুরুতর ঘটনা। গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নগরীর জনবহুল খানজাহান আলী রোডের খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম (৪৩)। পেশাগত দায়িত্ব পালন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে চলাচলের সময় ছিনতাইকারীরা তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার হাত গুরুতর জখম হয়। পরিস্থিতি এতাই গুরুতর ছিল যে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথমে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার হাতের ক্ষত এতই মারাত্মক যে অস্ত্রোপচার করে আঙুল কেটে ফেলার পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। এই একটিমাত্র ঘটনা প্রমাণ করে যে খুলনার অপরাধ জগতের দৌরাত্ম্য কতা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে, যেখানে একজন সশস্ত্র পুলিশ সদস্যও নিরাপদ নন।
পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমের ওপর হামলার পরপরই জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) থেকে একটি দাফতরিক চিঠি (স্মারক নম্বর ৫০৬২) ইস্যু করা হয়। ওই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
এ বিষয়ে খুলনার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানান, পুলিশ কর্মকর্তা শাহ আলম বর্তমানে শঙ্কামুক্ত থাকলেও তার আঘাতের গভীরতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে এবং পুলিশ কর্মকর্তারা যেন নতুন করে হামলার শিকার না হন, সে জন্যই এই সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। একইভাবে খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস-ভারপ্রাপ্ত) এম এম শাকিলুজ্জামান জানিয়েছেন যে, বাহিনীর সকল সদস্যের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসন পুরোপুরি সচেতন রয়েছে।
পুলিশের এই বিশেষ নির্দেশনার পর খুলনার বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, নারী নেত্রী এবং নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, এই ধরনের প্রকাশ্য ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে আস্থার বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে।
খুলনার বিশিষ্ট আইনজীবী বাচ্চু শেখ এই নির্দেশনার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটি খুবই দুঃখজনক। পুলিশকে রাতে একা চলতে সতর্কতা দরকার হলে সাধারণ মানুষের আশা-ভরসা কোথায়? হ্যাঁ, পুলিশকেও ঝুঁকিমুক্ত থাকতে হবে। কিন্তু সেটা অভ্যন্তরীণভাবে করার সুযোগ ছিল। কিন্তু এভাবে ওপেন ঘোষণা দিয়ে পুলিশকে সতর্ক করলে সাধারণ মানুষ আরও সংকটে পড়তে পারে।"
নারীদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে নারী নেত্রী সিলভী হারুন বলেন, "পুলিশের রাতে একা চলাচলে সংকট হলে সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি কতা ভয়াবহ, তা উপলব্ধি করা যায়। আর নারীরা তো আরও অসহায়। ঢাকায় ভোর চারটা থেকে বাস চলাচল শুরু হয়, যেখানে নারী, পুরুষ ও শিশু সবাই যাতায়াত করে। ভোর ছয়টায় ট্রেনেও একই চিত্র দেখা যায়। পুলিশ যদি নিজেই সংকটে পড়ে, তবে এই মানুষগুলো রাতে একা কীভাবে বের হবে? পুরুষের চেয়ে নারীরাই এর ফলে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।"
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামানও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, "নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশকেই যদি রাতে একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে? খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই এসেছে।"
