বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে বাড়ছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে পরিবারগুলোর সক্ষমতা কাঠামোগত সীমায় পৌঁছেছে। অর্থনীতির এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু স্থিতিস্থাপকতা নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
শনিবার (১৭ অক্টোবর ) ঢাকার সিআইআরডিএপি মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডাইনামিকস অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’–এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। বইটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন হোসেন জিল্লুর রহমান ও নামিরা শামীম।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন শুধু বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক ধাক্কার মুখে নয়; বরং উচ্চ দারিদ্র্য, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির একটি কাঠামোগত ফাঁদে আটকে পড়েছে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুরতার বিষয়ে পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যের মধ্যে মিল রয়েছে।
পিপিআরসির জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ অনুযায়ী, দেশে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি ব্যয়ভিত্তিক জিনি সহগ বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৩৬ হয়েছে, যা আয় ও ভোগের বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বা ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তারা দারিদ্র্যসীমা ও মধ্যম আয়ের স্তরের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। স্থবির আয়, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে যেকোনো সময় তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত। ফলে এসব পরিবারকে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসার পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দারিদ্র্য বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য, নিম্ন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত চাপে রয়েছে। ২০২২ সালে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২৭.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৩৫ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যারা যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি।
পিপিআরসির বিশ্লেষণে বলা হয়, পরিবারভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে মধ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি কেবল বহিরাগত সংকটের কারণে চাপে নেই; এর পেছনে রয়েছে বিনিয়োগের স্থবিরতা, সীমিত উৎপাদনশীলতা এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সুষমভাবে বণ্টিত না হওয়ার মতো কাঠামোগত সমস্যা।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেম বলেন, অর্থনীতির সামনে থাকা প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাণিজ্য, সরকারি অর্থব্যবস্থা ও জ্বালানি দক্ষতায় অবিলম্বে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরবরাহব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আয়বৈষম্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি আগের মতো দ্রুতগতিতে মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে পারছে না। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, গত ২০ বছরে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্য কোনো খাত প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা আগে ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরো বলেন, এখন শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জির তরুণেরা একটি সাধারণ অনুমতিপত্র পেতে সরকারি দপ্তরে ৩০ থেকে ৪০ বার যাতায়াত করার মতো হয়রানি মেনে নিতে আগ্রহী নয়।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা না থাকায় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তৈরি পোশাক খাতে নারীদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে কৃষি ও পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগ, শিশু যত্নকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল নীতি গ্রহণ জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে সমন্বিত কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি তৈরি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীলতার রূপান্তর এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের বাইরে নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তোলা, বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা প্রয়োজন। সরকারি সেবা থেকে হয়রানি কমানো, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নারী ও তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারলে অর্থনীতির ভিত আরও শক্তিশালী হবে।
সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কারণে সৃষ্ট কাঠামোগত ফাঁদকে অবিলম্বে স্বীকার করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি অর্থনীতির রূপান্তরের জন্য পাঁচটি স্তম্ভের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ‘ট্রানজিশন কমপ্যাক্ট’ বা রূপান্তরকালীন সমঝোতার প্রস্তাব করেন। স্তম্ভগুলো হলো— ১. অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ২. প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি তৈরি। ৩. মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। ৪. উৎপাদনশীলতার রূপান্তর। ৫. দ্রুত দৃশ্যমান ফলাফল অর্জনে শাসনব্যবস্থার সংস্কার।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে ‘হয়রানি’কে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থাজুড়ে বিস্তৃত একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন, যা মানুষের শক্তি, উদ্যোগ ও স্বপ্নকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থায় হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাকে কাঠামোগত সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে উঠে আসা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির পরস্পরসংযুক্ত সংকট।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাময়িকভাবে ধাক্কা সামলে ওঠার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা জরুরি। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানিতে বহুমুখীকরণ, দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের পথ তৈরি হতে পারে।
