নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে ৯৭৩ জনের সংখ্যা প্রকাশের খবর সামনে আসার পর জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। তালিকায় কারা রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কে কে আছে- এসব প্রশ্ন ঘুরছে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজি, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, ঝুট ব্যবসা ও জমি দখল ঘিরে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগের হিড়িক পড়ে যায় জেলায়। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নারায়ণগঞ্জে একটি চাঁদাবাজির তালিকা তৈরি করে পুলিশ। তবে সেটি প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তালিকা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটির ১১ নম্বর ব্যাটালিয়নের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে চাঁদাবাজ হিসেবে ৫৬৫ জনের নাম রয়েছে। একই অঞ্চলে আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন ৪০৮ জন। দেশজুড়ে চাঁদাবাজ ও আলোচিত সন্ত্রাসীর তালিকায় সংখ্যার দিক থেকে এই জেলা শীর্ষে রয়েছে। এসআরবি-১১ এর প্রস্তুত করা একটি নথিতে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় সভা, মিছিল, কর্মীসমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেন।
তবে রাজনৈতিক সক্রিয়তার পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও সামনে এসেছে।
চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, ঝুট ব্যবসা, জমি দখল, ডকইয়ার্ড ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে এসব অভিযোগ স্থানীয় রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি করেছে। কোনো কোনো ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তার হয়েছে, আবার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। আবার অনেককে দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ফলে এসআরবির সংখ্যা প্রকাশের খবর সামনে আসার পর স্থানীয়ভাবে আলোচিত এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে নানা তৃণমূল থেকে প্রভাবশালীদের সম্পর্ক রয়েছে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে পরিবহন ও শিল্পকারখানা কেন্দ্রিক ব্যবসা। এসব খাতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে সাতজনকে আটক করে। সংঘর্ষের পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। সেইসাথে শহরে মৌমিতা পরিবহনকে কেন্দ্র করেও চাঁদাবাজির অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছিল।
এমনকি শিল্পাঞ্চল ফতুল্লার এনায়েতনগরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হন।
সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড এলাকাতেও ঝুট ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও গুলির ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জে জমি দখলের চেষ্টা ও জমির মালিকপক্ষকে মারধরের অভিযোগ এবং বন্দর এলাকায় ডকইয়ার্ডে চাঁদা দাবি ও লোহা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এমনকি ভাড়ায় নেওয়া জাহাজ কেটে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে মামলার ঘটনাও রয়েছে। এতে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি সামনে এসেছে।
চাঁদাবাজির পাশাপাশি মামলা-বাণিজ্য নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখের পর থেকে। ভুক্তভোগীদের কারও কারও অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ বা আর্থিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে কাউকে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। আবার মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও অর্থ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কারও ছবি দেখিয়ে আটক করানো কিংবা মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এসআরবির তালিকা প্রকাশের খবর সামনে আসার পর আলোচনার কেন্দ্রে এখন তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়। তাদের মধ্যে কতজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে অন্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চান স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
তাদের কাছে তালিকাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শুধু সংখ্যার কারণে নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও সম্পদের নিরাপত্তার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত বলে। তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কেউ থাকলে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, সেটিও স্বচ্ছভাবে জানার দাবি রয়েছে।
এখন তালিকার তথ্য যাচাই, জেলাভিত্তিক সংখ্যা প্রকাশ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেইসাথে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা যেন রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে ছাড় না পান।
৫৬৫ চাঁদাবাজ ও ৪০৮ জন সন্ত্রাসীর তালিকা ঘিরে জেলাজুড়ে শুরু হওয়া আলোচনা। শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর পদক্ষেপে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
