দেশে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিশেষ দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারী জ্বালানি তেলের (এইচএফও বা ফার্নেস অয়েল) বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। চলতি অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) থেকে অনেক বেশি পরিমাণে ফার্নেস তেলের চাহিদার কথা জানানোও হয়েছে। কিন্তু এই চাহিদা শতভাগ পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সম্প্রতি বিপিসি থেকে পিডিবিকে দেওয়া এক চিঠির সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বিপিসি সাধারণত বছরে দুইবার জ্বালানি
তেল আমদানির সূচি ঠিক করে। ফলে হঠাৎ করে অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানো কঠিন। এ কারণে অক্টোবর মাসে এই সংকট তৈরি হয়েছে।
চিঠির সূত্রে জানা যায়, চলতি অক্টোবর মাসের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে বিপিসিকে এক লাখ ৯১ হাজার ৮৩৮ টন ফার্নেস তেলের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। তবে বিপিসি ফিরতি চিঠিতে বিপিডিকে জানিয়েছে, আমদানি এবং স্থানীয় উৎস থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ ৩৬ হাজার টন ফার্নেস তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে। যার মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে পূর্বনির্ধারিত ৭৫ হাজার টন। অতিরিক্ত চাহিদা জন্য আরও এক কার্গো জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। তবে চাহিদার পুরো তেল নানা কারণে আমদানি সম্ভব নয়। বিপিসি থেকে বিপিডিবিকে অতিরিক্ত ফার্নেস তেলের ঘাটতি মেটাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের মাধ্যমে আমদানি করতে বলা হয়েছে।
চাহিদা ও সরবরাহে মাসভিত্তিক ব্যবধান : বিপিসি তাদের চিঠিতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত এইচএফও বা ফার্নেস তেলের চাহিদা ও গ্রহণের হিসাব দিয়েছে। এতে দেখা যায় বিপিডিবি গত কয়েক মাসে চাহিদা বেশি দিলেও জ্বালানি তেল কম গ্রহণ করেছে বিপিসি থেকে। জানুয়ারিতে চাহিদা ছিল ৩৩ হাজার ৩৯৮ টন, বিপরীতে গ্রহণ করা হয় ১৯ হাজার ১১৬ টন। ফেব্রুয়ারিতে ৪২ হাজার ৪১৯ টন চাহিদার বিপরীতে গ্রহণ করা হয় ২৩ হাজার ২০১ টন।
এপ্রিল ও মে মাসেও চাহিদার তুলনায় তেল গ্রহণ কম ছিল। এপ্রিলে ৮৬ হাজার ৬৬৫ টন চাহিদার বিপরীতে গ্রহণ করা হয় ৬৫ হাজার ৩০৩ টন। মে মাসে ৮৯ হাজার ৪৬৮ টন চাহিদার বিপরীতে গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ১২৪ টন।
তবে মাসভিত্তিক চিত্রে আবার উল্টো প্রবণতাও রয়েছে। জুলাই ও আগস্টে চাহিদার তুলনায় বেশি তেল গ্রহণের তথ্য দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহের ঘাটতি সব মাসে একই রকম ছিল না; মাসভেদে চাহিদা, সরবরাহ ও গ্রহণের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। অক্টোবর মাসে এই চাহিদা অনেকটাই বেড়ে যায়।
অক্টোবরে অতিরিক্ত আমদানির সুযোগ সীমিত : বিপিসির চিঠিতে জানানো হয়, সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ পরিমাণ এবং বিদ্যমান জেটি সক্ষমতা বিবেচনায় অক্টোবর মাসে অতিরিক্ত ফার্নেস অয়েল আমদানির সুযোগ সীমিত। এ ছাড়া ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানের কারণে বিপিডিবির আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অক্টোবর মাসের জন্য বিপিডিবির পরিকল্পনায় মোট ১৫টি পার্সেল জ্বালানি তেল সূচিবদ্ধ রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মজুদ, অক্টোবরের আমদানি এবং স্থানীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত তেল মিলিয়ে ন্যূনতম মজুদ বজায় রেখে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিপিসির একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, জ্বালানি তেল আমদানির সূচি ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে ব্যবধান থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল আমদানি করলেও মজুদ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে চাহিদার সঠিক পূর্বাভাস, সময়মতো আমদানি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রভিত্তিক মজুদ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। বিপিডিবি একবার গত বছরের চাহিদার বিবেচনায় বিপিসিকে আমদানির চাহিদা দিয়েছে। পরে আবার নতুন করে সংশোধিত বা বাড়তি চাহিদা দিয়েছে। অথচ বিপিসি সাধারণত বছরে দুইবার জ্বালানি তেল আমদানির সূচি ঠিক করে। ফলে হঠাৎ করে অনেক বেশি জ্বালানি তেল আমদানির চাহিদা দিলে সেটা জোগান দেওয়া কঠিন। আবার চাহিদা দিয়ে বিপিডিবি যদি তেল গ্রহণ না করে সেক্ষেত্রেও বিপিসিকে বিপাকে পড়তে হয়।
এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে বেশি পরিমাণে ফার্নেস তেল আমদানির চাহিদা দিয়েছে বিপিডিবি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি চাহিদার জোগান দিতে।
