।। আলআমিন হোসাইন।। আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুজন ভাইয়ের মৃত্যুতে মনে যে গভীর ব্যথা পেয়েছি, যে শূন্যতা অনুভব করছি, তা প্রতিটি মুহূর্তে হাহাকার সৃষ্টি করে চলেছে। তা ছাড়া, আমার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার একটি কথাই ভেসে উঠছে—সুজন ভাইয়ের পরিবারটির কী হবে? তাঁর তিনটি নাবালক সন্তান—একটি ছেলে ও দুটি মেয়ে। তাঁর ফুটফুটে সুন্দর ছোট্ট মেয়েটির বয়স সবেমাত্র ৪ বছর। নাম— সাফা। আহা, চার বছরের ছোট্ট সাফা সোনামণিটি আর বাবার সাথে খুনসুটি করতে পারবে না! আর কোনো দিন ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারবে না! একবার ভাবুন, এটা কতটা কষ্টের!
মো. মোস্তফা কামাল খান (সুজন) ছিলেন ‘দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ’-এর শহর প্রতিনিধি ও কম্পিউটার বিভাগের দক্ষ অপারেটর। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি শহরের মিশন রোডস্থ ‘জনকল্যাণ ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড ডেন্টাল কেয়ার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
এবার আসি তাঁর বড় মেয়ে মীরার প্রসঙ্গে। মীরা মাসখানেক আগে সম্ভবত এক সহপাঠীর সাথে খেলতে গিয়ে শরীরে মারাত্মক আঘাত পায়। এতে তার এক পায়ের রানের হাড় প্রায় গুঁড়ো হয়ে যায়, যার অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রয়োজন। সুজন ভাই ঘটনার দিনই ‘দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ’-এর বার্তা সম্পাদক এএইচএম আহসান উল্লাহ ভাইয়ের সহযোগিতায় সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। তারপর শুরু হয় তাঁর ও তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ। এজন্যে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মহোদয়ের প্রতি আকুল আবেদন— সুজন ভাইয়ের মেয়ে মীরা অন্য যে সহপাঠী মেয়ের কারণে শরীরে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন, তার ক্ষতিপূরণ বাবদ একটি অমীমাংসিত ঘটনা রয়েছে। এটি নিয়ে থানায় বসলেও সুজন ভাইকে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে বলে শুনেছি। এ বিষয়ে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করি। এর মধ্যে অন্য কোনো ব্যক্তির অযাচিত হস্তক্ষেপ আমরা চাই না।
আপনি জানেন, আমাদের সুজন ভাই জীবনের যে সময়টাতে নিজেকে একটু গুছিয়ে সমৃদ্ধ জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, ঠিক তখনই মেয়ের এমন দুর্ঘটনায় তাঁর মনের ওপর দিয়ে কী পরিমাণ ঝড় বয়ে গেছে? ঠিক কী ধরনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে তাঁর নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারটি? আমরা সহকর্মীরা খুব কাছ থেকে তাঁর সেই কঠিন সময় পার হতে দেখেছি।
সুজন ভাই যেদিন মারা গেলেন, সেদিন আমাদের রোটা. উজ্জ্বল হোসাইন ভাই, এপিপি অ্যাডভোকেট ইয়াসিন আরাফাত ইকরাম ভাই, মাহমুদা খানম আন্টি, আমি, আমার বন্ধু কাজী আজিজুল হাকিম (নাহিন), এএইচএম আহসান উল্লাহ ভাই, সেলিম রেজা ভাই এবং মাও. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান গাজী ভাই তাঁর শহরের তালতলাস্থ বাসায় গেলাম। সকলের চোখেই ছিল অশ্রু। সেদিন একটি কথাই বারবার কানে এলো—মেয়েটি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় সুজন ভাই মনে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। মেয়ের চিকিৎসার এত ব্যয় তিনি কীভাবে জোগাড় করবেন, বাবা হিসেবে তিনি সেটি এড়িয়ে যেতে পারেননি। জীবদ্দশায় সুজন ভাই আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘আলআমিন, আল্লাহ আমাকে সুখের মুখ দেখাচ্ছেন।’ অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চাইতেন, জীবনে তিনি যে কষ্ট করেছেন, সেখান থেকে ধীরে ধীরে তাঁর উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু মেয়ের দুর্ঘটনায় তিনি আবার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে যান। তিনি মেয়ের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়েও বলতেন। বলতেন, হায়দার আলী নামে এক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে অকাতরে সহযোগিতা করছেন। তা ছাড়া আনোয়ার জাহিদ নামে তাঁর আরেক সহকর্মী/শুভাকাঙ্ক্ষীও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সহযোগিতা করছেন আরও অনেকেই। কিন্তু ভবিষ্যতে মেয়েটিকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে যে অর্থের প্রয়োজন, সেটার কী হবে? যদিও তিনি মুখ ফুটে কিছু বলতেন না, কিন্তু আমরা তা অনুধাবন করতে পারতাম।
আমি বিশ্বাস করি, সুজন ভাইয়ের অসহায় পরিবার—বিশেষ করে অসুস্থ বড় মেয়েটিকে সুস্থ করে তুলতে এই শহরের কেউ না কেউ দায়িত্ব নেবেন। কারণ, মেয়েটি যখন বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছাবে, তখন যেন এই শারীরিক অসুস্থতা কোনো প্রতিবন্ধকতা না হয়ে দাঁড়ায়, তা অবশ্যই আমাদের সমাজের সবাইকে গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। সুজন ভাইয়ের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ দায়িত্ব এ সমাজ ও দেশ পালন করুক। সেটা হতে পারে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের মহানুভবতা (যাঁর অধীনে সুজন ভাই দীর্ঘদিন কাজ করেছিলেন এবং যতটুকু জানি, মানিক সাহেব সুজন ভাইকে চেনেনও)। হতে পারে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মহোদয়ের আন্তরিকতা, সিভিল সার্জন মহোদয়ের পরামর্শ, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহযোগিতা কিংবা চাঁদপুর প্রেসক্লাবের যুগান্তকারী কোনো উদ্যোগ; অথবা রাজনৈতিক দলগুলোর সুদৃষ্টি। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরাও স্বউদ্যোগে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে পারেন—নিতে পারেন অসুস্থ মেয়েটিকে সুস্থ করার মহান দায়িত্ব। তাহলে নাগরিক হিসেবে যেমন আমরা মনে প্রশান্তি পাব, তেমনি সুজন ভাইয়ের বিদেহী আত্মাও শান্তি পাবে।
আলআমিন হোসাইন : মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার (চাঁদপুর), কালের কণ্ঠ; স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ। মুঠোফোন : ০১৯৯০৫৯৫৪৫৫, মধ্য ইচলী, চাঁদপুর। বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
