দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। অথচ অটোমেশন, অনলাইনে শুল্ক পরিশোধ ও ডিজিটাল গেট পাসের মতো উদ্যোগের পরও পণ্য খালাসে গতি বাড়ছে না। বন্দরে আসা কনটেইনার ছাড়াতে দীর্ঘ সময় লাগার পেছনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, নথিপত্রের জটিলতা ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে খালাসে কোন পক্ষ কতটা সময় নিচ্ছে, তা নিয়ে কাস্টমস, বন্দর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরসের (এলপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা একটি কনটেইনার খালাস করে বন্দর চত্বরের বাইরে নিতে গড়ে ৭.৮ দিন লাগত। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৩ দিনে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ২০২২ সালের টাইম রিলিজ স্টাডি (টিআরএস) অনুযায়ী আমদানি পণ্য খালাসে গড় সময় ছিল ১১ দিন ছয় ঘণ্টা ২৩ মিনিট। ২০২৫ সাল ও ২০২৬ সালের শুরুতেও খালাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ দিন লাগার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে এই দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এলপিআইয়ে বন্দরে কনটেইনারের অবস্থানের গড় সময় পরিমাপ করা হয়। অন্যদিকে টিআরএসে পণ্য বন্দরে পৌঁছানো থেকে আমদানিকারকের হাতে খালাস পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপের সময় হিসাব করা হয়।
কাস্টমসের টিআরএস অনুযায়ী পণ্য খালাসের মোট সময়ের ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় আমদানিকারক ও তাদের নিয়োজিত কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের প্রক্রিয়ায়। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে ব্যয় হয় ১৪ শতাংশ, কাস্টমসের মূল্যায়ন বা অ্যাসেসমেন্টে আট শতাংশ, অন্যান্য সরকারি সংস্থার সেবা ও সনদ পেতে দুই শতাংশ এবং শিপিং এজেন্টদের কার্যক্রমে লাগে এক শতাংশ সময়।
সমীক্ষাটিতে ৬০২টি বিল অব এন্ট্রি বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ৩২৬টি গার্মেন্টসের কাঁচামাল, ৯৬টি ফার্মাসিউটিক্যালস, ৯২টি মূলধনী যন্ত্রপাতি ও ৮৮টি খাদ্যপণ্যের চালান। এসব চালানের মধ্যে মাত্র ২৩১টি, অর্থাৎ ৩৮ শতাংশের আগাম প্রক্রিয়াকরণ হয়েছিল। তবে সমীক্ষাটি চার ধরনের পণ্যের এক সপ্তাহের তথ্যের ভিত্তিতে করায় বন্দরে আসা সব ধরনের কনটেইনারের প্রতিনিধিত্ব করে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমন্বয়হীনতায় কাজে আসছে না
ডিজিটাল উদ্যোগ
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় আগে থেকেই টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) চালু রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার সঙ্গে বন্দরের সিস্টেমের সংযোগ থাকায় কোনো কনটেইনার আটকে রাখলে তার তথ্য জানা যায়। এ ছাড়া ই-গেট পাস ও ডিজিটাল মাধ্যমে গেট ফি পরিশোধের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে।
কাস্টমসের কার্যক্রমও ধাপে ধাপে ডিজিটাল করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) আংশিকভাবে চালু হয়। এর আওতায় আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট ১৯টি সরকারি সংস্থার সনদ, লাইসেন্স ও
অনুমতিপত্রের আবেদন সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এ ব্যবস্থায় চার লাখ ৩১ হাজার ১৬৯টি সনদ, লাইসেন্স ও পারমিট ইস্যু হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি কাস্টমস কৌশলপত্রে ২০২৭ সালের মধ্যে বিএসডব্লিউ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই পণ্য খালাসের সময় কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় নথি, শুল্ক-কর পরিশোধ, পরীক্ষা, অনুমোদন ও পরিবহনের ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে প্রস্তুত না থাকলে এক ধাপের কাজ শেষ হলেও পরের ধাপে অপেক্ষা করতে হয়। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য তাৎক্ষণিক বিনিময় এবং প্রতিটি ধাপে বিলম্বের সময় শনাক্ত করার ব্যবস্থা আরো কার্যকর করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও সেবা সমন্বিত করতে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সব সংস্থার সেবা ও তথ্য বিনিময় এখনো পুরোপুরি একীভূত হয়নি। বিভিন্ন সংস্থার সফটওয়্যারের সংযোগ, অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ সালের শেষদিকে ব্যবস্থাটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আট ধাপে কনটেইনার খালাস
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু হয় জাহাজের আগমনের মধ্য দিয়ে। এরপর শিপিং এজেন্টের ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্টো (আইজিএম) দাখিল, আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিল অব এন্ট্রি জমা, কাস্টমসের শুল্কায়ন, শুল্ক-কর পরিশোধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, বন্দর থেকে ডেলিভারি এবং সবশেষে গেট আউটের মাধ্যমে কনটেইনার বন্দর ছাড়ে।
কাস্টমসের ২০২২ সালের টিআরএস অনুযায়ী বিল অব এন্ট্রি অনলাইনে দাখিল করতেই গড়ে আট দিন পাঁচ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট সময় লেগেছিল। এর সঙ্গে হার্ডকপি জমা দিতে আরো ১২ ঘণ্টা আট মিনিট ব্যয় হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আইজিএম দাখিলের পরও অনেক ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে প্রায় সাত দিন লাগে। ব্যাংক থেকে আমদানিসংক্রান্ত মূল নথি সংগ্রহ এবং তা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে পৌঁছাতে বিলম্ব এর অন্যতম কারণ।
টিআরএসে এসব কার্যক্রমে সমন্বিত ট্র্যাকিংয়ের অভাব এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিকে বিলম্বের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কাস্টমসের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কনটেইনার ডেলিভারি নেওয়া হয়। টিআরএস অনুযায়ী পণ্য খালাসের মোট সময়ের ১৪ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এরপর ই-গেট পাস ও ডিজিটাল গেট ফি-সহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে কনটেইনার বন্দরের গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী জানান, শিপিং এজেন্টরা অনেক সময় প্রয়োজনীয় নথি দ্রুত সরবরাহ করেন না। স্ক্যান করা কপি গ্রহণ না করায় বিদেশি সরবরাহকারীর কাছ থেকে মূল নথি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে বিল অব এন্ট্রি দাখিলেও দেরি হয়।
কাস্টমস কর্তারা জানান, আমদানিকারকের প্রয়োজনীয় নথি দাখিলে দেরি, শুল্ক-কর পরিশোধে বিলম্ব এবং পণ্যের ঘোষণায় অসংগতির কারণেও পণ্য খালাসে বেশি সময় লাগছে। কাস্টমসের শুল্কায়ন কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হলেও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যক্রম সমন্বিত না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি গতিশীল করা সম্ভব হচ্ছে না।
জাহাজ বন্দরে আসার পর আমদানি পণ্যের আইজিএম দাখিল করা হয়। এরপর আমদানিকারক বা তাদের নিযুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে বিল অব এন্ট্রি পণ্যে ঘোষণা দাখিল করতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আইজিএম দাখিলের পরও বিল অব এন্ট্রি দাখিল করতে প্রায় সাত দিন সময় লাগছে। ব্যাংক থেকে আমদানি-সংক্রান্ত মূল নথি সংগ্রহ এবং সেগুলো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে পৌঁছাতে দেরি হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম কাস্টমসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় নথি যথাসময়ে জমা পড়লে দ্রুত শুল্কায়ন সম্ভব। তবে পণ্যের ঘোষণায় অসংগতি বা মিসডিক্লারেশন পাওয়া গেলে আইনি প্রক্রিয়ায় তা নিষ্পত্তি করতে হয়। প্রয়োজনে বিষয়টি আধা-বিচারিক নিষ্পত্তিতে যেতে পারে এবং আইন অনুযায়ী জরিমানাও আরোপ করা হতে পারে। শুল্ক-কর পরিশোধে দেরি হলেও পণ্য খালাস পিছিয়ে যায়।
সমীক্ষা নিয়ে আপত্তি ব্যবসায়ীদের
কাস্টমসের সমীক্ষায় পণ্য খালাসের মোট সময়ের ৭৫ শতাংশ আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের প্রক্রিয়ায় ব্যয়ের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, চেম্বারসসহ অন্য আমদানি-রপ্তানিকারকরাও জড়িত। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা করা একপেশে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে সমীক্ষা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বন্দরের কার্যক্রমে মোট সময়ের ১৪ শতাংশ ব্যয়ের তথ্য নিয়েও আপত্তি রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরের নিজস্ব কার্যক্রমে এত সময় লাগার কথা নয়। কীসের ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে, তা তাদের জানা নেই। বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় ভালো বলেও দাবি করেন তিনি।
