মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো ও সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবল হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু আঞ্চলিক ইন্টারনেট সেবাই নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বৈশ্বিক তথ্য আদান-প্রবাহও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিজিটাল অবকাঠামো বর্তমানে ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই সেবার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে এসব স্থাপনায় হামলা হলে প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের আশপাশে সংঘাত বাড়লে একাধিক ক্যাবল রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রতলের ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হলে বিকল্প যোগাযোগপথ দিয়ে তথ্য পরিবহন করা সম্ভব। তবে এতে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে, যোগাযোগে বিলম্ব বাড়তে পারে এবং কিছু ডিজিটাল সেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্যাবল মেরামতেও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এসব স্থাপনায় সরাসরি হামলা কিংবা বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্লাউড কম্পিউটিং, অনলাইন লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
চলতি বছরের মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) দুটি স্থাপনায় ড্রোনের আঘাত এবং বাহরাইনে আরেকটি স্থাপনার কাছাকাছি হামলার ঘটনা ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে কোনো একটি ডেটা সেন্টারে হামলা হলেই পুরো অঞ্চলের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে বিকল্প নেটওয়ার্কের সক্ষমতা, তথ্যের ব্যাকআপ, একাধিক স্থানে সেবা পরিচালনার ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের ওপর।
ডিজিটাল যোগাযোগের ঝুঁকি কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প স্থলভিত্তিক ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক ও নতুন যোগাযোগপথ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ইরাক হয়ে তুরস্কের দিকে তথ্য পরিবহনের রুটও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশ ডেটা সেন্টার এবং এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতে অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব বিনিয়োগের নিরাপত্তা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেখা দিলে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার ব্যয়ও বাড়তে পারে।
ইরানের হুমকি বাস্তবে কতটা বড় বিপর্যয়ে রূপ নেবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল স্থাপনা ও যোগাযোগপথে হামলা হলে এর প্রভাব একাধিক দেশ ও মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরি, ডেটা সেন্টারের ভৌত ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, তথ্যের একাধিক ব্যাকআপ রাখা এবং দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট অবকাঠামো কেবল প্রযুক্তিগত সম্পদ নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
The post ইরানের হুমকিতে ঝুঁকিতে উপসাগরীয় ডেটা সেন্টার, ব্যাহত হতে পারে বৈশ্বিক ইন্টারনেট appeared first on ভোরের চেতনা.
