পাবনার মালিগাছার প্রবীণ সাংবাদিক, বাম সংগঠক, কলামিস্ট ও পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য আব্দুল জব্বারের ইন্তেকালে সাংবাদিকতা অঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ৭২ বছর বয়সে তাঁর প্রস্থান শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, বরং সাংবাদিকতা, দেশপ্রেম ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায় সমৃদ্ধ একটি কর্মময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।
আব্দুল জব্বার ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, সংবাদমাধ্যম ও মানুষের কথা বলার প্রত্যয়। পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিকতাকে শুধু জীবিকা হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা, মানুষের সুখ-দুঃখের কথা বলা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামনে আনার দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করেছেন।
দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৪ মার্চ ঝড়ে পাবনার মনোহরপুর খাঁপাড়া পাওয়ার গ্রিড এলাকায় একটি বৃহৎ বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার খুলে পরে। এ ঘটনায় তৎসময়ের কয়েকজন বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতাকে আসামী করে ‘নাশকতার’ মামলা দেওয়া হয়। বার্তা সংস্থা পিপ এর পক্ষ থেকে এ ঘটনার অনুসন্ধানী রির্পোট করেন। ফলে ঐ সময়ে বিএনপি নেতাদের নাশকতা প্রমান হয়নি। ফলে তারা ঐ মামলা থেকে রেহাই পান। এ জন্য আব্দুল জব্বারকে ৫০ হাজার টাকা পুরুস্কার প্রদান করা হয়।
আব্দুল জব্বারের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে আত্মত্যাগ, সাহস ও স্বাধীনতার অনন্য অধ্যায়। সেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন মানুষ হিসেবে তাঁর জীবন ও পরিচয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। স্বাধীনতার চেতনা, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তাঁর ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।
মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তিনি “ইতিহাসের পাতা থেকে” নামক একটি বই বের করেন।
সাংবাদিক আব্দুল জব্বার পাবনার সংবাদমাধ্যম অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি দৈনিক খোলা কাগজের পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি দৈনিক সোনার আলো, বার্তা সংস্থা পিপ এবং বিএনসি ২৪ ডটকমের সঙ্গে তাঁর সাংবাদিকতার সম্পর্ক ছিল। সংবাদ সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।
তিনি শুধু সংবাদ প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; কলাম লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। কলাম লেখার মাধ্যমে একজন লেখক সমসাময়িক ঘটনা, সমাজের সমস্যা, মানুষের প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের নানা বিষয় নিয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশের সুযোগ পান। আব্দুল জব্বারের লেখালেখির এই পরিচয় তাঁর বহুমাত্রিক সাংবাদিকসত্তার পরিচায়ক।
পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য হিসেবে আব্দুল জব্বার সাংবাদিকদের বৃহত্তর পেশাগত পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিকতা একটি ব্যক্তিনির্ভর কাজ হলেও এর শক্তি নিহিত থাকে পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পেশাগত সংহতির মধ্যে। প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা নবীনদের জন্য পথনির্দেশক হতে পারে। তাঁদের দীর্ঘ পথচলার গল্প থেকে পরবর্তী প্রজন্ম সংবাদ সংগ্রহ, পেশাগত দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষা নিতে পারে।
তাঁর মৃত্যুতে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও পরিচিতজনেরা হারালেন তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিচিত একজন মানুষকে। তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং পেশাগত জীবনের নানা ঘটনা নিশ্চয়ই অনেকের মনে দীর্ঘদিন অমলিন থাকবে।
পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছার সঙ্গে আব্দুল জব্বারের পরিচয় ও জীবনযাত্রার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। স্থানীয় সাংবাদিকেরা তাঁদের এলাকার মানুষের কথা, সমস্যা, সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। এভাবে তাঁরা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেন না, স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখেন। আব্দুল জব্বারের দীর্ঘ সাংবাদিকতা সেই বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর পদবি কিংবা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর কাজ, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সমাজে রেখে যাওয়া স্মৃতির মধ্যেও তা বেঁচে থাকে। আব্দুল জব্বারের জীবনকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, সাংবাদিকতা, লেখালেখি এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততাকে সম্মিলিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শনিবার ভোর রাত ৪টার দিকে পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা এলাকার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি) পাবনা জেলার পলিটব্যুরোর সদস্য ও পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে নাতী নাতনিসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।
অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন। তিনি বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরাঞ্চল, ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খোলা কাগজ, দৈনিক সোনার আালো এবং বার্তা সংস্থা পিপ এর স্টাফ রির্পোটার হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি মালিগাছা ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিক মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন পাবনা -৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, পাবনা প্রেসক্লাব, পাবনা সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ।
শনিবার বাদ জোহর পাবনা সদর উপজেলার মজিদপুর গোরস্থান প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাকে মজিদপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়।
৭২ বছরের জীবন শেষে আব্দুল জব্বারের এই চলে যাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও তাঁর কাজ ও অবদান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবন সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যায়।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সাংবাদিক আব্দুল জব্বার।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান,

স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা অফিস ও সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব।
