আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় আসন্ন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে হেগে তিন সপ্তাহব্যাপী শুনানি শেষ হয়েছে এবং আদালত এখন তার রায় ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাওদা এ জালো-র বরাত দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রায়টি অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যেই আশা করা হচ্ছে । এই রায় কেবল রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ নিপীড়নের বিচারিক স্বীকৃতি নয়। বরং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গতিপথ পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে।
২০১৯ সালের নভেম্বরে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে গাম্বিয়া আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত অস্থায়ী ব্যবস্থা (provisional measures) জারি করে মিয়ানমারকে গণহত্যামূলক কাজ প্রতিরোধের নির্দেশ দেয় । ২০২২ সালের জুলাইয়ে আদালত মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে জানায়, গাম্বিয়ার মামলা করার অধিকার রয়েছে ।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত হেগে পূর্ণাঙ্গ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গাম্বিয়ার পক্ষে তিনজন রোহিঙ্গা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দেন—যাদের মধ্যে একজন অশিক্ষিত নারী, যিনি রোহিঙ্গা ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন । তাঁরা স্বজনদের হত্যা, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার বর্ণনা দেন।
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, ৮ লাখেরও বেশি মানুষের ওপর এই নির্বিচার নিপীড়ন—শিশু হত্যা, পালিয়ে যাওয়া মানুষের পেছনে গুলি—কোনোভাবেই সাধারণ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হতে পারে না।
মিয়ানমারের প্রধান যুক্তি ছিল, তারা কেবল আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-র বিরুদ্ধে "সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান" চালিয়েছে। কিন্তু গাম্বিয়ার আইনজীবীরা জবাব দেন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে নারী-শিশু পুড়িয়ে মারা বা ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া কখনোই বৈধ হতে পারে না। এমনকি মিয়ানমার একপর্যায়ে দাবি করে, তারা রোহিঙ্গাদের "নিধন" নয়, "দেশছাড়া" করতে চেয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারে হত্যা করে বিতাড়িত করাও গণহত্যার অন্তর্ভুক্ত।
এগারোটি রাষ্ট্র—কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, আয়ারল্যান্ড, মালদ্বীপ ও স্লোভেনিয়া—গণহত্যা কনভেনশনের ব্যাখ্যায় হস্তক্ষেপ (intervention) করেছে। মিয়ানমারের পক্ষে কোনো রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেনি।
আইসিজের ইতিহাসে এটি হবে প্রথমবার, যখন কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার জন্য দায়ী করা হতে পারে। এর আগে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে মামলায় আদালত গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছিল, কিন্তু সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের দায় প্রতিষ্ঠা করেনি।
তবে এই রায়ের তাৎপর্য কেবল রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মামলার ওপরও এই রায়ের গভীর প্রভাব থাকবে। মিয়ানমার যেভাবে "সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান" শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে, ইসরাইলও গাজায় "হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই" বলে একই ধরনের যুক্তি দিচ্ছে। আইসিজে যদি মিয়ানমারের এই অজুহাত প্রত্যাখ্যান করে, তবে তেল আবিব আইনি চাপে পড়বে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মামলায় পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনগুলোকে "বিশেষভাবে বিশ্বাসযোগ্য" বলে আদালতের সামনে তুলে ধরেছে । মিয়ানমার এই প্রতিবেদনগুলোর নির্ভরযোগ্যতা তীব্রভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে।
রোহিঙ্গা সাক্ষীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (LAW)-এর নির্বাহী পরিচালক আন্তোনিয়া মালভে বলেছেন, কক্সবাজারের শরণার্থীদের জন্য এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ রোহিঙ্গা মনে করেন তাদের জন্য আসল বিচার হলো মিয়ানমারে পূর্ণ নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া এবং রোহিঙ্গা পরিচয়ের অধিকার নিশ্চিত করা।
তারা শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অপরাধীদের সাজা চায় না—তারা চায় ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বাতিল, ভিটেমাটি ফেরত এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে নিরাপদ প্রত্যাবাসন।
এই দাবিগুলো কোনো আবেগের বুলি নয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে তোলে। সেই আইন বাতিল না হলে কোনো প্রত্যাবাসনই টেকসই হবে না।
আইসিজের রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক। কিন্তু আদালতের নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। কোনো রাষ্ট্র রায় না মানলে বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যায়। সেখানে মিয়ানমারের পক্ষে রাশিয়া ও চীনের ভেটো দেওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু এখানেই বিষয়টি শেষ হয় না। LAW ও স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমার (SAC-M)-এর যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি ইতিবাচক রায় রাষ্ট্রগুলোর ওপর তিনটি দায় তৈরি করবে: (১) বেআইনি পরিস্থিতিকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া, (২) তা বজায় রাখতে সহায়তা না করা, এবং (৩) তা বন্ধে সহযোগিতা করা । এই দায়গুলো সরাসরি অস্ত্র হস্তান্তর, জেট ফুয়েল সরবরাহ, ব্যাংকিং লিংক এবং জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, রায় কার্যকর না হলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ওজন বা গুরুত্ব বিশাল। বিশ্বমঞ্চে বিচ্ছিন্নতা এড়াতে যেকোনো ভবিষ্যৎ বার্মিজ সরকারকে এই রায়ের দায় নিতে হবে।
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ রাশিয়া, চীন, ভারত ও জাপান-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই আশা করে তারা/আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের ওপর প্রভাব ব্যবহার করে টেকসই সমাধান খুঁজতে সাহায্য করবে । বাংলাদেশের এই কৌশল সঠিক। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের উচিত:
প্রথমত, রায়ের পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি তুলে ধরা—যেখানে ভেটো নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বর্তমানে সাধারণ পরিষদের সভাপতি। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুকে উচ্চ পর্যায়ে রাখা সম্ভব ।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের বন্ধু দেশগুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত কূটনৈতিক চাপ দেওয়া—বিশেষ করে চীন, যার মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে।
তৃতীয়ত, রায়ের পর প্রত্যাবাসনের শর্ত স্পষ্ট করা—নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ভূমি অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। রায় যদি গণহত্যা প্রতিষ্ঠা করে, তবে এই শর্তগুলো পূরণ না করে প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হবে।
আইসিজের রায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তবে, রায় কেবল একটি কাগজ। আসল প্রশ্ন হলো: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই রায়কে রোহিঙ্গাদের জীবনে পরিবর্তনে রূপ দিতে প্রস্তুত কি না?
LAW ও SAC-M-এর প্রতিবেদন সতর্ক করেছে, "অপেক্ষা ও দেখো" (wait-and-see) নীতি ব্যর্থ হবে। রায় ঘোষণার পর কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করলে চলবে না; রাষ্ট্রগুলোকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে ।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুযোগ—কেবল একটি মামলার ফলাফল হিসেবে নয়, বরং রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের দীর্ঘ লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে। রায় যদি ইতিবাচক হয়, তবে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক, আইনি ও মানবিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের প্রকৃত শর্ত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আর যদি রায় প্রতিকূল হয়? LAW-এর প্রতিবেদন স্পষ্ট: "গণহত্যা প্রমাণিত হয়নি" এমন রায় মিয়ানমারের নির্দোষতার প্রমাণ নয়। তখনও নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সার্বজনীন এখতিয়ার এবং রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে ।
রোহিঙ্গারা নয় বছর ধরে অপেক্ষা করছে। আইসিজের রায় সেই অপেক্ষার একটি উত্তর দেবে। কিন্তু সেই উত্তর কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর—কেবল আদালতের রায়ের ওপর নয়।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
