হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (Discharge) পাওয়ার পর ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর ফলোআপের সময়সূচি সাধারণত শিশুর শারীরিক অবস্থা, ডেঙ্গুর তীব্রতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। সবার জন্য একই সময়সূচি প্রযোজ্য নয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় চিকিৎসক যে নির্দেশনা দেন, তা অনুসরণ করা জরুরি।
প্রথম ফলোআপ
বিজ্ঞাপন
ছাড়পত্র পাওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ করাতে হবে। বাড়ি ফেরার পর শিশুর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা, হেমাটোক্রিট এবং সার্বিক দুর্বলতা বা পানিশূন্যতার কোনো লক্ষণ আছে কি না—তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে। শিশুর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক রক্তের পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
দ্বিতীয় ফলোআপ
জ্বর পুরোপুরি কমে যাওয়ার পর এবং বাড়ি ফেরার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আরেকটি ফলোআপ করা যেতে পারে। এ সময় শিশু স্বাভাবিক খাবারে ফিরছে কি না—অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে কি না এবং রক্তের উপাদানগুলোর মাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ রক্ত গণনা (সিবিসি) বা অন্যান্য পরীক্ষা করানো হতে পারে।
বিশেষ ক্ষেত্রে করণীয়
শিশু অত্যন্ত দুর্বল থাকলে, রক্তে প্লেটলেট বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকলে কিংবা লিভার বা অন্য কোনো অঙ্গে জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসক ঘন ঘন ফলোআপের পরামর্শ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রতি দুই থেকে তিন দিন পরপর বা পরিস্থিতি অনুযায়ী আরো দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হতে পারে। ফলোআপের নির্দিষ্ট তারিখ ও নির্দেশনা হাসপাতালের ছাড়পত্রে (Discharge Certificate) উল্লেখ থাকলে তা অনুসরণ করতে হবে।
শারীরিক ও মানসিক জটিলতা
ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পরও কিছু শিশুর শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডেঙ্গু-পরবর্তী সময়ে ক্লান্তি, দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য ও মনোযোগের ঘাটতির মতো সমস্যা থাকতে পারে। এসব সমস্যা সব শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটালে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
১. চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা
ডেঙ্গু-পরবর্তী সময়ে শিশুদের মধ্যে ক্লান্তি ও অবসাদ দেখা দিতে পারে। সামান্য হাঁটাচলা বা খেলাধুলা করলেও তারা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে এবং আগের মতো শক্তি ফিরে পেতে সময় লাগতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি (Chronic Fatigue) কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠা ৬০-৭০ শতাংশ শিশুর মধ্যে এ সমস্যা দেখা যায়—এমন নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা উচিত নয়। ক্লান্তির কারণ নির্ধারণে শিশুর শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল মূল্যায়ন করা জরুরি।
২. লিভারের সমস্যা
ডেঙ্গুর কারণে লিভারের এনজাইম—এসজিপিটি ও এসজিওটি বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে জ্বর কমার পরও কিছু শিশুর ক্ষুধামান্দ্য, পেটের ওপরের ডান দিকে অস্বস্তি বা ব্যথা এবং হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হতে পারে।
৩. চুল পড়া
জ্বর কমার কিছুদিন পর কোনো কোনো শিশুর চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি অসুস্থতা ও শারীরিক ধকলের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সাধারণত এ ধরনের চুল পড়া সাময়িক হয় এবং কয়েক মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। তবে চুল পড়া অতিরিক্ত হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৪. ক্ষুধামান্দ্য ও রুচি কমে যাওয়া
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর কিছু শিশুর ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। অসুস্থতার কারণে শরীর দুর্বল থাকলে স্বাভাবিক খাবারে ফিরতে সময় লাগতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই শিশুকে অল্প অল্প করে বারবার পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৬. পেশি ও গিঁটেব্যথা
ডেঙ্গুর তীব্র জ্বর কমে যাওয়ার পরও কিছু শিশুর হাত-পা, মাংসপেশি ও গিঁটে হালকা ব্যথা বা আড়ষ্টতা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। ব্যথা তীব্র হলে, বাড়তে থাকলে বা শিশুর চলাফেরায় সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৭. রক্তস্বল্পতা ও প্লেটলেটের মাত্রা কমে যাওয়া
ডেঙ্গুর সময় রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রায় পরিবর্তন হতে পারে। কোনো কোনো শিশুর হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে ফ্যাকাশে ভাব, দুর্বলতা বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার সময় সাধারণত প্লেটলেটের মাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে রক্তের পরীক্ষার ফল ও শিশুর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নয়, শিশুর সামগ্রিক অবস্থাও বিবেচনা করা জরুরি।
৮. রোগ প্রতিরোধক্ষমতা
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর সব শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে অসুস্থতার পর কিছুদিন দুর্বলতা ও ক্লান্তি থাকতে পারে। এ সময়ে শিশুর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সুষম খাবার এবং প্রয়োজনীয় তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। নতুন কোনো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পরামর্শ
শিশুকে পর্যাপ্ত তরল ও সুষম খাবার দিতে হবে। বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপ এবং অন্যান্য উপযুক্ত তরল দেওয়া যেতে পারে। ফল, শাকসবজি, ডিম, মাছ ও খিচুড়ির মতো পুষ্টিকর খাবার শিশুর সহনশীলতা অনুযায়ী দেওয়া যেতে পারে। শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দিতে হবে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার আগপর্যন্ত জোর করে পড়াশোনা, খেলাধুলা বা ভারী কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা উচিত নয়।
এ সময় শিশুর মানসিক ও শারীরিক যত্ন অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: শিশু বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ঢাকা
