গত কয়েক বছরে ফোনের বক্সের গায়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা বেশ চোখে পড়ছে। এটি যেমন গর্বের এক অনুভূতি, তেমনি দেশের শিল্প খাতের অগ্রগতির একটি চিহ্ন। তবে এর মধ্যেও কমেছে স্থানীয়ভাবে তৈরি হ্যান্ডসেটের সংখ্যা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুসারে, জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ১৬ লাখ ২৯ হাজার হ্যান্ডসেট তৈরি করেছে। এক বছর আগে একই সময়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৪৭ হাজার। অর্থাৎ, এক বছরে উৎপাদন কমেছে ৫ লাখ ১৮ হাজার ইউনিট বা ২৪ দশমিক ১ শতাংশ।
এর পেছনে বিদ্যমান করকাঠামো, অন্যান্য আনুষঙ্গিক (লজিস্টিকস) খরচ, বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনসহ বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তবে সন্দেহাতীতভাবে এর পেছনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে এ খাত দখল করে থাকা বিশাল অননুমোদিত বাজার বা গ্রে মার্কেট। বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশের মুঠোফোন বাজারের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই অনুমোদনহীন হ্যান্ডসেটের দখলে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ফোনের ক্ষেত্রে বৈধ ও অননুমোদিত হ্যান্ডসেটের দামের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে বেশি।
এ সমস্যার অর্থনৈতিক প্রভাব বৃহত্তর। অবৈধ উপায়ে বিদেশ থেকে ফোন আসার কারণে প্রতিবছর সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা।
দামের এ পার্থক্য কমানোর চেষ্টা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বিদেশ থেকে ফোন আমদানিতে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। তবে এই কমানো শুল্ক কার্যকর ছিল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত।
জুনের পর সেই হ্রাসকৃত শুল্ক আর বহাল রাখা হয়নি। তখন বলা হয়, এই সিদ্ধান্তের ফলে বৈধ পথে ফোন আমদানি বা দেশে উৎপাদন তেমন বাড়েনি।
এখন আমদানি করা ফোনের ওপর সম্মিলিত করভার ৪৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়ও এই করহার বেশি। ভারতে এই হার প্রায় ২২ থেকে ২৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ, নেপালে ১৮ থেকে ২৫ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। পুরোপুরি আমদানিনির্ভর মালদ্বীপে মুঠোফোনের ওপর কর প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
এ কারণে বাংলাদেশের বর্তমান করকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ কতটা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
চলতি বছরের জুনের শেষ দিক থেকে বৈধ পথে ফোন আমদানির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ফোনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। অন্যদিকে গ্রে মার্কেটের ফোন এখনো তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়াতে কোম্পানিগুলোর আগ্রহও কমছে। দামের পার্থক্যের কারণে তৈরি এসব সমস্যা ছাড়াও বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে হ্যান্ডসেট উৎপাদনের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বেশির ভাগ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ফোন আসলে কমপ্লিটলি নকড-ডাউন (সিকেডি) ও সেমি নকড-ডাউন (এসকেডি) পদ্ধতিতে উৎপাদন করা হয়। এসব পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশের বেশি যন্ত্রাংশ, যেমন চিপসেট, ডিসপ্লে, ক্যামেরা সেন্সর ও সার্কিট বোর্ড ইত্যাদি আমদানি করা হয়। দেশে মূলত সংযোজন, প্লাস্টিক মোল্ডিং, প্যাকেজিংয়ের মতো কাজ করা হয়। উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরির জন্য যে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি। এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন বড় ধরনের বিনিয়োগ।
আমদানি করা সেমিকন্ডাক্টর ও ডিসপ্লের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে টাকার মানের ওঠানামা এবং ডলারের সংকটও স্থানীয় উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে ফোনের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে দুটি বিকল্প—সরকারি ভর্তুকি অথবা পুরোনো প্রজন্মের ও ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ব্যবহার, তবে এর কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এসব যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে বিদেশি আসল যন্ত্রপাতি উৎপাদক বা অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারদের (ওইএম) বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে, এমন একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
গ্রাহকদের চাহিদার ধরনও এর মধ্যে বদলেছে। ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে বিশ্ববাজারে মেমোরি ও চিপসেটের দাম বাড়ায় ফোনের দামও বেড়েছে। ফলে অনেক গ্রাহক তুলনামূলক কম দামের গ্রে মার্কেটের ফোন, সস্তা বা রিফার্বিশড ফোনের দিকে ঝুঁকছেন। একজন গ্রাহকের জন্য এটি স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। তবে এই প্রবণতা দেশে একটি ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে হ্যান্ডসেট উৎপাদনে এরই মধ্যে বিনিয়োগ করা কোম্পানিগুলোর ব্যবসা চালিয়ে যেতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রেডিক্টেবিলিটি বা পূর্বানুমানযোগ্যতা।
প্রথমেই স্মার্টফোনশিল্পের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কর-শুল্কনীতি। নীতিমালায় স্থিরতা ও ধারাবাহিকতা থাকলে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকে। এতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও শুধু ফোন সংযোজন করার পরিবর্তে তুলনামূলক কম খরচে উচ্চমানের স্মার্টফোন স্থানীয়ভাবে তৈরি করতে আরও আস্থা পাবে।
বড় পরিসরে মোবাইল ফোন সংযোজনে বাংলাদেশ এরই মধ্যে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। দেশে আগামী ১০ বছরের মধ্যে একটি কার্যকর ও ধারাবাহিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ ও পণ্য উৎপাদন বাড়বে। সরকারি সহায়তা থাকলে কোম্পানিগুলোও পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে আরও বিনিয়োগ করতে আস্থা পাবে। এতে অ্যাসেম্বলি লাইন বাড়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় হবে। দেশের তরুণদের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এর মাধ্যমে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে।
লেখক: কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট
