ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে নিরাপত্তায় চরম ঝুঁকির মুখে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে কড়া নিরাপত্তায় একাধিক বাঙ্কারের সুবিধা থাকা রাজপ্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচির পর থেকে যুবরাজকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি।
যুবরাজের সুরক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, ইরান–সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে লড়াই তীব্র হওয়ায় তার নিরাপত্তা রক্ষায় কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি বাহিনী তার নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে।
‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এর তথ্যানুযায়ী, মোহাম্মদ বিন সালমানকে কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া বাঙ্কারযুক্ত প্রাসাদগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়তই স্থানান্তর করা হচ্ছে। অবস্থান পরিবর্তনের এই কৌশল উচ্চ-পর্যায়ের কোনও লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শত্রুর পক্ষে অনুমান করা কঠিন করে তোলে।
ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলার সময় সুরক্ষিত স্থান হয়ে ওঠে। যুবরাজ বিন-সালমানের নিরাপত্তা দলটিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বেছে নেওয়া কর্মীবাহিনী রয়েছে। যুবরাজের সঙ্গে সবসময় একটি বিশেষভাবে নির্বাচিত নিরাপত্তা দল থাকে, যারা তাকে রক্ষা করার দায়িত্বে থাকে, বিশেষ করে তীব্র হুমকির মধ্যে।
গত এক দশকের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয় গত শনিবার। বিমানবন্দরে হুতিদের ওই হামলায় ভারতীয় নাগরিক ছাড়াও চার জন সৌদি নাগরিক, দুই বাংলাদেশি, এক মার্কিন, এক ফিলিস্তিনি, মিশর, জর্ডন, সিরিয়া ও সুদানের এক জন করে নাগরিক-সহ অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়।
হামলার জেরে টার্মিনাল-৪-এ আগুন ধরে যায়। এরপর রোববারেও আরেকটি হামলায় এক জনের মৃত্যু হয় ও ১১ জন আহত হয়।
গত পাঁচ দিনে চার বার ওই বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। হুতিদের এক মুখপাত্র দায় স্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে।
হুতিদের আক্রমণের জবাবে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সলমন হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, হামলার ভয়াবহতা অনুযায়ী সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমানহামলায় সরাসরি যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে রিয়াদের কর্মকর্তারা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন যে, হুতিদের মুহুর্মুহু হামলা রুখতে গিয়ে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কার্যত ফুরিয়ে আসছে। কর্মকর্তারা গতমাসেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ঘাটতি মেটাতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিশরের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই মূলত হুতিদের সঙ্গে এই লড়াইয়ের সূচনা। দীর্ঘদিন পর ২০২২ সালে দু’পক্ষের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পরই সেই যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যায়।
ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দরে একটি ইরানি বিমান অবতরণের চেষ্টার সময় সৌদি বাহিনীর গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠার পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
উত্তেজনা কমাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রঅর মধ্যে ফোনে আলোচনা হয়েছে। সামরিক আগ্রাসন এড়িয়ে রিয়াদকে রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার বার্তা দিয়েছে তেহরান।
পাশাপাশি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই লড়াইয়ের ফলে আরব উপদ্বীপে অস্থিরতা বাড়ছে এবং এতে লাভবান হচ্ছে একমাত্র ইসরায়েল।
