দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে বসতঘর থেকে দুই শিশু সন্তান ও গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ওই গৃহবধূর স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আটক করেছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের জুগিরডাঙ্গা মাঠের পূর্ব পাশে মোস্তফাপুর বালুপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন ওই এলাকার শাকিল ইসলামের (২৬) স্ত্রী স্বর্ণা আক্তার (২৪) ও তাদের ছেলে সাফায়েত (২), মেয়ে রইফা মনি (৯ মাস)।
এ ঘটনায় ওই গৃহবধূর বাবা খাইরুল ইসলাম বাদী হয়ে চিরিরবন্দর থানায় ৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোস্তফাপুর বালুপাড়ার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে শাকিল হোসেনের সাথে পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ি এলাকার খাইরুল ইসলামের মেয়ে স্বর্ণা বেগমের গত সাড়ে ৩ বছর পুর্বে প্রেমের সুত্র ধরে বিয়ে হয়। বিয়ের পর শাকিল মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা, মাদক সেবন করা নিয়ে মাঝে মধ্যে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকত।
শাকিল হোসেন বলেন, ‘দুপুরের পর অটো নিয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী বাবার বাড়ি যাওয়ার জন্য টাকার আবদার করে। আমি পরেরদিন যাওয়ার কথা বলে অটো নিয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে যাই। সন্ধায় বাড়ি ফিরে অনেক ডাকাডাকি করে ঘরের দরজা না খোলায় দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে স্ত্রীকে ঝুলন্ত ও সন্তানদের মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি।’
মৃত গৃহবধুর শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন বলেন, ‘অন্যের বাড়িতে মজুরের কাজ শেষে সন্ধার পরপরই বাড়িতে ফিরে ভাত খাওয়ার সময় ছেলের বউ, নাতী-নাতনী কারো কোন সাঁড়া না পাওয়ায় অনেক ডাকাডাকি করেও দরজা না খোলায় বাড়ির মধ্য বরাবর টিনের বেড়া ভেঙ্গে ছেলের ঘরের দরজা খুলে বউমার মরদেহ নামিয়ে আনি। চিৎকার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশিরা এগিয়ে আসে ও আমার স্ত্রী নাতী-নাতনী দুটোকে কোলে নিয়ে কান্না শুরু করে।’
নিহতের মা আনজু আরা বলেন, ‘জামাই শাকিল আমাদের ফোনে জানায়, আমাদের মেয়ে সন্তানগুলোকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করেছে। সংবাদ পেয়ে দ্রুত জামাইয়ের বাড়িতে আসি। তবে ৩ মাস পুর্বে মেয়ে জানিয়েছিল, জামাই নেশা করে।’
মৃত গৃহবধুর বড় ভাই ও শাকিলের আপন ভগ্নিপতি শাহানুর সজীব বলেন, ‘আমি বিয়ের পর হতে ৬ বছর এই বাড়িতে পাশাপাশি লাগোয়া ঘরে থাকতাম। বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও ছুটিতে এসে গত শনিবার এই বাড়িতেই ছিলাম। বোন আত্মহত্যা করেছে নাকি স্বামী মেরে ফেলেছে, ঘটনাটি বুঝতে পারছিনা।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আমিন শাহ বলেন, ‘তাদের পারিবারিক কলহ ছিল কিনা জানিনা। কেউ কোনদিন অভিযোগ দেয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, বোঝা যাচ্ছেনা। প্রশাসন এসেছে, তারা তদন্ত করছে। ঘরের দেয়ালে কিছু লেখা ছিল, লেখাগুলি কে লিখেছে, জানা যাচ্ছে না। তবে লেখা ছিল আজ থেকে এ গল্প শেষ। আমি অভাগি মা। আমার সন্তানদের নিজে মারছি। সন্তানদের পুলিশের কাছে দিয়েন না। লাশ পলাশবাড়িতে মাটি দেন। শাকিল যেন না ছোয়, বাবা মা সরি। আই লাভ ইউ চিহ্ন ছিল।’
জেলা পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা বলেন, ‘ঘটনার প্রকৃত রহস্য বা মোটিভ উদ্ধার করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ শুরু করেছে।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আমরা আলামত সংগ্রহ করেছি, সুরতহাল করেছি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গৃহবধুর স্বামী শাকিল হোসেন শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন ও শ্বাশুরী রহমত আলা তারাবিবিকে হেফাজতে নিয়েছি। মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য জানা যাবে।’
চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুন নবী বলেন, ‘ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্রই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। দ্রুত এলাকাটি ফাঁকা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষকে জানাই। রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে সিআইডির ক্রাইম বিশেষজ্ঞ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এরপর মরদেহ গুলো উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। রাতে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বামী শাকিল নিজেই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য জানতে অধিকতর তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।’
