ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় ক্ষতিকারণ প্রমাণিত হওয়ায় মামলা দায়ের করলেও বিক্রি বন্ধ করা যায়নি সেভেন-আপ (7up)। তদারক সংস্থাগুলোর রহস্যজনক নিরবতার পাশাপাশি ভোক্তাদের অসচেতনায় মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে জনস্বাস্থ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যাকে ক্যানসারের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, সেই অ্যাসপারটেম (মিথাইল ইস্টার) মাত্রাতিরিক্ত হারে পাওয়া গেছে সেভেন-আপে। ফেনাইলকিটোনুরিয়া নামক বংশগত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অ্যাসপারটেম ক্ষতিকর, তাদের শরীর ফেনাইল্যালানিন ভেঙে ফেলার ঝূঁকি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন।
২০২৩ সালের ১৪ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) অ্যাসপার্টেমের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন ফলাফল প্রকাশ করে। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO)-এর যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি অন ফুড অ্যাডিটিভস (JECFA) দ্বারা প্রতিবেদনটি তৈরী করা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার, অ্যাসপার্টেমকে মানুষের জন্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে (IARC গ্রুপ ২বি) শ্রেণিবদ্ধ করেছে। 'গ্রুপ ২বি' তালিকায় কোনো উপাদানকে তখনই রাখা হয় যখন মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টির বিষয়ে সীমিত প্রমাণ পাওয়া যায়। সেভেন আপের অতিরিক্ত অ্যাসপার্টেম, সাথে অন্যান্য খাদ্য ও ওষুধ হতে প্রাপ্ত অ্যাসপার্টেম মিলে মানব দেহের জন্য হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা (যা এক ধরণের যকৃতের ক্যান্সার) সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু অ্যাসপারটেম নয় কৃত্রিম বা সিন্থেটিক শূন্য-ক্যালোরি মিষ্টিও (এসিসালফেম) বিপজ্জনক মাত্রায় পাওয়া গেছে সেভেন-আপে। সাধারণ চিনির তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ বেশি মিষ্টি এসিসালফেম ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্তদের জন্য ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এটি বেশি খেলে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। মাথাব্যথা ও মেজাজের পরিবর্তন: সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম মিষ্টির অতিরিক্ত ব্যবহার মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিডিএস মান অনুযায়ী, এসিসালফেম পটাশিয়ামে নির্ধারিত মান অনুর্ধ ৩০০ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা, সেখানে পাওয়া গেছে ৪৫০ মিলিগ্রাম, অ্যাসপারটেম (মিথাইল ইস্টার) এর মান অনুর্ধ ৭০০ মিলিগ্রামের স্থলে পাওয়া গেছে ১০০০ মিলিগ্রাম। ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক পরীক্ষার ৬টি প্যারামিটারের মধ্যে ৫টি ব্যাপক তারতম্য পাওয়া গেছে।
ল্যাবে মানহীন প্রমাণিত হওয়ায় ইসরাইলি কোমল পানীয়টির বাংলাদেশে বাজারজাতকারি ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আদালত একমাত্র আসামী সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সমন জারি করেছে। মামলার ধার্য তারিখ রয়েছে আগামী ১৬ নভেম্বর।
এই যখন অবস্থা তখন ভোক্তা অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো রহস্যজনক নিরাবতা পালন করছে। আর সেই সুযোগে দেদারসে বেচাকেনা চলছে বিষাক্ত সেভেন আপ। এতে করে শিশু থেকে শুরু করে সকলেই মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। অবিলম্বে বাজার থেকে ওই লটের সেভেন-আপ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রেসিডেন্ট শফিকুজ্জামান বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, কোন পণ্য মানহীন প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে কেন করা হয়নি, তাদের দিক থেকে বলা উচিত। আমি মনে করি বিষয়টি অবশ্যই সিরিয়াসভাবে দেখা উচিত। জনস্বাস্থ্যের ঝূঁকি থাকলে সেখানে কোন প্রকার ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্যাব অবশ্যই বিষয়টি দেখবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যাপক আলোচিত ব্যক্তিত্ব মাহবুব কবীর মিলন। তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, বিডিএস (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড) মান রয়েছে, সেটি যথাযথভাবে পালন না করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখানে সেভেন আপের রক্ষে পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এমনকি মান অনুযায়ী থাকলেও লেভেলিংয়ে উল্লেখ না থাকলেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক পরীক্ষায় মানহীন হওয়ায় মামলাটি দায়ের করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহাং কামরুল হাসান। এজাহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্য বিশ্লেষক ইলিয়াস জাহেদী সেভেনআপ মানসম্পন্ন নয়, এবং নিরাপদ নয় বলে সনদপত্র প্রদান করেছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেড এর হেড অব ব্র্যান্ড শরিফুদ্দিন শ্যামলকে একাধিক দফায় ফোন দিলেও রিসিভ করেননি। হোয়ার্টসাঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়ে বক্তব্য চাইলেও কোন উত্তর দেননি। পরে ট্রান্সকম বেভারেজ এবং সেভেন-আপের মূল কোম্পানি পেপসিকোর বক্তব্য চেয়ে বার্তা২৪.কম এর পক্ষ থেকে মেইল করা হয়। ৯দিন পার হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
