গালিবা আনতারা সোয়ারা
বিশ্বকাপের গোলের উন্মাদনায় যখন দেশ মেতে ওঠে, ঠিক তখনই কোনো এক মায়ের আর্তনাদ নীরবে হারিয়ে যায়। একদিকে উল্লাস, অন্যদিকে সন্তানের অপেক্ষায় অসহায় এক মায়ের দীর্ঘশ্বাস। এই দুই বাস্তবতা একই সমাজে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ একটির শব্দ অন্যটিকে ঢেকে দেয়। আমরা গোলের হিসাব রাখি, জয়ের উল্লাসে মেতে উঠি, কিন্তু কত মায়ের বুক খালি হয়ে যাচ্ছে, কত স্বপ্ন মাঝপথে থেমে যাচ্ছে—সেই হিসাব রাখি না। এ যেন এমন এক সময়, যেখানে বিনোদনের শব্দ অনেক সময় মানবতার আর্তনাদকেও চাপা দিয়ে ফেলে।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার তমিজা খাতুন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী কোহিনূরকে ধর্ষণের পর হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ দেশকে আবারও নাড়িয়ে দিয়েছে। হাওর মানেই বিস্তীর্ণ জলরাশি, শান্ত প্রকৃতি আর নির্ভার মানুষের জীবন। অনেকের কাছে এটি নিরাপত্তা, সরলতা ও শান্তির প্রতীক। কিন্তু আজ সেই হাওরের বুকেও এমন নৃশংসতার অভিযোগ উঠেছে, যা আমাদের গভীরভাবে বিচলিত করে। যে জনপদকে মানুষ শান্তির নীড় বলে ভাবতে ভালোবাসে, সেখানেও যদি একটি কিশোরীর জীবন নিরাপদ না থাকে, তবে প্রশ্ন জাগে—এই দেশের কোনো প্রান্তই কি আজ নারীদের জন্য সত্যিই নিরাপদ? যখন হাওরের নীরবতাও এমন ঘটনার সাক্ষী হয়, তখন বোঝা যায়, সংকটটি শুধু একটি এলাকার নয়; এটি সমগ্র সমাজের। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিবেকের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন। তদন্ত চলমান থাকায় সত্য উদ্ঘাটন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে এমন ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি অবশ্যই জোরালো হওয়া উচিত।
কোহিনূরের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে রামিসা, আছিয়া, উর্মির মতো আরও অনেক নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নৃশংস সহিংসতার শিকার হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা কয়েক দিন দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, মানববন্ধন হয়, বিচারের দাবি ওঠে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কোনো ঘটনার আড়ালে পুরোনো ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায়। আমরা যেন ভুলে যাই, প্রতিটি সংবাদের পেছনে ছিল একটি মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি অসমাপ্ত জীবন। আজ ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি কিংবা পারিবারিক সহিংসতার খবর যেন প্রতিদিনের সংবাদ। খবরের কাগজ খুললেই নতুন কোনো কোহিনূর, নতুন কোনো নির্যাতনের গল্প। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এসব খবর আমাদের কাছে যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। অথচ প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একটি মায়ের কান্না এবং একটি জীবনের নির্মম সমাপ্তি।
পরিসংখ্যানও একই উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, নারী অধিকার সংগঠন ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হন ৮১৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। ২০১৯ সালে তা বেড়ে ১,৪১৩ জনে পৌঁছে যায়। একই বছরে ৭৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং ১০ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। ২০২৩ সালে প্রায় ১,০০০টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়। ২০২৪ সালে সংবাদমাধ্যমে ৫১৬টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হলেও পুলিশের হিসাবে সারা দেশে ৫,৫৭০টি ধর্ষণের মামলা হয়। ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ৭৮৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫২.৩ শতাংশ বেশি। একই বছরে পুলিশের হিসাবে ৭,০৬৮টি ধর্ষণের মামলা হয়। এর মধ্যে ১৭৯টি ছিল গণধর্ষণের মামলা এবং ৬৮ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০ মে পর্যন্ত শুধু শিশু ধর্ষণের ১১৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এছাড়া এপ্রিল মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক সংখ্যা। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার, একটি থেমে যাওয়া স্বপ্ন এবং একজন মানুষের অসহনীয় বেদনা।
একটি ধর্ষণের ঘটনা শুধু একজন নারী বা শিশুর ওপর আঘাত নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের বিবেক এবং একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ওপর আঘাত। আইন আছে, শাস্তির বিধানও আছে। কিন্তু আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রয়োগ হয় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমানভাবে। বিচার দীর্ঘসূত্রতার শিকার হলে মানুষের আস্থা কমে যায় এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই প্রতিটি নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।" অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষিত। কিন্তু যখন একজন নারী ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল কিংবা জনসমাগমস্থলে নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারেন না, তখন প্রশ্ন জাগে—এই সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবে কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? তবে শুধু আইন করলেই সমাজ বদলায় না। আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু একজন মানুষকে মানবিক করে তুলতে পারে না। সেই শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। সন্তানকে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান, সম্মতির মূল্য এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ নারীর নিরাপত্তা শুধু নারীর একার বিষয় নয়; এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয়।
আজ প্রশ্ন জাগে—আর কত কোহিনূর, রামিসা, আছিয়া, উর্মির গল্প শুনতে হবে? আর কত মা সন্তানের লাশের অপেক্ষায় দিন গুনবেন? আর কত মেয়েকে স্বপ্নের বদলে ভয়কে সঙ্গী করে বড় হতে হবে? আমরা কি এমন এক সমাজ গড়ছি, যেখানে অপরাধীরা ভয় পায়, নাকি এমন এক সমাজ, যেখানে ভুক্তভোগীরাই ভয়ে বাঁচে? আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো মাকে সন্তানের জন্য আহাজারি করতে না হয়; যেখানে কোনো মেয়েকে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্বপ্ন থামিয়ে দিতে না হয়; যেখানে সুবিচারের দাবিতে রাস্তায় নামতে না হয়, বরং ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বাস্তবতা। যে দেশে একজন নারী রাতের অন্ধকারেও নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারবেন, একটি শিশু ভয় ছাড়াই স্কুলে যেতে পারবে, আর একজন মা বিশ্বাস করতে পারবেন—তাঁর সন্তান নিরাপদে ঘরে ফিরবে। যেদিন কোনো নারী নির্যাতনের খবর আর সংবাদপত্রের নিয়মিত শিরোনাম হবে না, সেদিনই হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থে সভ্য সমাজের দাবি করতে পারব। ততদিন পর্যন্ত আমাদের নীরব থাকার সুযোগ নেই। কারণ নীরবতা কখনো অন্যায়ের সমাধান নয়; অনেক সময় নীরবতাই অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে। নারী শুধু সংবাদপত্রের একটি শিরোনাম নন; তিনি একজন পূর্ণ মানুষ—স্বপ্ন, অধিকার, মর্যাদা ও সম্ভাবনায় সমান। তাঁর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার শুধু সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত হোক—এটাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
গালিবা আনতারা সোয়ারা
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
