পিরোজপুরের কালীগঙ্গা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় আট বছরের মেয়ের মৃত্যুর পর নিখোঁজ মায়ের মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সকালে নাজিরপুর উপজেলার মধুরাবাদ এলাকায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় রিনা বেপারীর মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে নেছারাবাদ উপজেলা প্রশাসন।
আজ বিকেল ৪ টার সময় নিহত রিনা বেপারীর স্বামী শংকর বেপারীর হাতে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশিক আহমেদ।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে নেছারাবাদ ও নাজিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী ফেরিঘাটসংলগ্ন কালীগঙ্গা নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ৫০ জনের বেশি যাত্রী ও ছয়টি মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচলকারী একটি ট্রলার কাত হয়ে পড়লে দুর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা। অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় নদীর তীরে উঠতে সক্ষম হন। তবে নিখোঁজ হন নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের বাসিন্দা রিনা বেপারী ও তাঁর আট বছরের মেয়ে অদ্রিতা বেপারী।
দুর্ঘটনার রাতেই অদ্রিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর বুধবার সকাল ৯টার দিকে মধুরাবাদ এলাকায় কালীগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মা রিনা বেপারীর মরদেহ। দুর্ঘটনায় নদীতে ডুবে যাওয়া পাঁচটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘাট পরিচালনায় অনিয়ম, পর্যাপ্ত নৌযানের সংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, রাত ৮টার পর ঘাটে পর্যাপ্ত ট্রলার না থাকায় যাত্রীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই একটি ট্রলারে নদী পার হন। এ সময় অতিরিক্ত যাত্রী ও মোটরসাইকেল বহনের কারণে ট্রলারটির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ট্রলারের ধারণক্ষমতা, যাত্রী ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা, চালকের দায়িত্ব এবং ঘাট পরিচালনার সার্বিক ব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। চালকের গাফিলতি কিংবা ঘাট পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে ঘাটে কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাব বন্ধ, নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর, পর্যাপ্ত নৌযান নিশ্চিত এবং রাতে নিরাপদে নদী পারাপারের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মঞ্জুর। তিনি উদ্ধার কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এ সময় পিরোজপুরে ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ডুবুরি দল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা এবং ঘাট পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
পুলিশ জানিয়েছে, ট্রলারডুবির কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তদন্তে কারও অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালীগঙ্গার এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মা-মেয়ের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে নদীপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা, ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং নিয়ম মেনে নৌযান চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
