চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পর রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ অপেক্ষা, পরীক্ষা করাতে সিরিয়াল না পাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাচ্ছে। সেখানে একই পরীক্ষার জন্য একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম ফি দিতে হচ্ছে। কোথাও কয়েকশ টাকা, কোথাও একই পরীক্ষার জন্য কয়েক হাজার টাকা বেশি। এই মূল্যবৈষম্য শুধু রোগীর ওপর আর্থিক চাপই বাড়াচ্ছে না, তৈরি করছে সেবার মান নিয়েও সংশয়।
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, সিবিসি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি ফির পার্থক্য এই বাস্তবতাই তুলে ধরে। একই ধরনের পরীক্ষার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ৪ হাজার ৫০০, আবার অন্য প্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। কোথাও এমআরআই করাতে খরচ ৮ হাজার টাকা, কোথাও ১৮ হাজার। যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, জনবল ও পরিচালন ব্যয়ের পার্থক্যের কারণে ফিতে কিছু ব্যবধান থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ব্যবধান কতটা যৌক্তিক, তা যাচাইয়ের সুযোগ রোগীদের নেই। বেশি দাম মানেই উন্নত সেবা, আবার কম দাম মানেই নিম্নমানের পরীক্ষাÑ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই। ফলে রোগীরা অনেকটা অনুমাননির্ভর হয়েই প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় বিনিয়োগ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ, ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় রয়েছেÑ এ কথা অনস্বীকার্য। তবে এসব ব্যয়ের দোহাই দিয়ে মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। স্বাস্থ্যসেবা নিছক সাধারণ পণ্যের বাজার নয়। এখানে রোগীর জরুরি প্রয়োজন, অসুস্থতা এবং বিকল্প সেবার সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে রোগীদের আর্থিক অসহায়ত্বের সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বেসরকারি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্সে নির্দিষ্ট সেবার ফি, রসিদ প্রদান ও মূল্যতালিকা প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন ও বিধান থাকাই যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মূল্যতালিকা প্রকাশ, নির্ধারিত ফি অনুসরণ এবং রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের যথাযথ হিসাব রাখার বিষয়গুলো নিয়মিত তদারক করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মান যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষাভিত্তিক যৌক্তিক মূল্যকাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি। যেসব পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যয়ের পার্থক্য বেশি, সেগুলোর মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি পর্যালোচনা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পরীক্ষার ফি ও সেবার ধরন সহজে দৃশ্যমান স্থানে এবং অনলাইনে প্রকাশের বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত তদন্ত এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষার সক্ষমতা, যন্ত্রপাতি ও জনবল বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না হয়। সরকারি সেবার মান ও প্রাপ্যতা বাড়লে বেসরকারি খাতেও জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা বাড়বে।
রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসার প্রথম ধাপ পরীক্ষা। এই ধাপেই যদি রোগীকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়, তাহলে চিকিৎসার অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা ও নিয়মিত নজরদারি। অসুস্থ মানুষের দুর্বলতা পুঁজি করে নয়, মানুষের সাধ্য ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত স্বাস্থ্যসেবা।