সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আজ বুধবার দেশে পালিত হবে ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস। এ বছর বিশ্ব মান দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শেয়ার্ড ভিশন ফর আ বেটার ওয়ার্ল্ড-অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ক্লিন এনার্জি’। বাংলায় এর ভাবার্থ ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’।
পণ্য ও সেবার মান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। এ বছর আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও), আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) যৌথভাবে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সপ্তম লক্ষ্য হলো সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত জ্বালানির প্রতিটি ইউনিটের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির জন্য ৭৯টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব মান নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪ হাজার ৬৩১টি বাংলাদেশ মান প্রণয়ন করেছে।
বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে স্থাপিত সোলার প্যানেল পরীক্ষণ গবেষণাগারে রয়েছে জার্মান প্রযুক্তির অত্যাধুনিক ‘সান সিমুলেটর’। এর সাহায্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল পরীক্ষা করা যায়। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে উন্নত আলোক উৎস ও ক্যালিব্রেটেড যন্ত্রপাতির মাধ্যমে গবেষণাগারটিতে সোলার প্যানেলের কার্যক্ষমতা ও গুণগত মান যাচাই করা হচ্ছে। বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়সহ বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে আলোচনা সভা এবং প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড স্থাপন করা হয়েছে।
শিল্প ও উৎপাদন খাতে পণ্যের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায়ও কার্যক্রমের পরিধি বাড়াচ্ছে বিএসটিআই। খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, পাট ও বস্ত্র এবং রাসায়নিক পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষণ ও সনদ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিল্পপণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের উৎপাদন-বিপণন বন্ধ এবং সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বিএসটিআই। এসব অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও নজরদারি কার্যক্রমের মাধ্যমে মোট ৩ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে এবং নয় জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৯২৪টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৯২১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এ ছাড়া নজরদারি কার্যক্রমের আওতায় ৮৭টি মামলা করা হয়। এসব অভিযানে পণ্যের মানসংক্রান্ত অনিয়মের পাশাপাশি ওজন ও পরিমাপে কারচুপির বিষয়টিও যাচাই করা হয়েছে। একই অর্থবছরে বিএসটিআই ৩ হাজার ৯১৬টি নতুন লাইসেন্স দিয়েছে এবং ৪ হাজার ৭১১টি লাইসেন্স নবায়ন করেছে। এ সময়ে ৮৩৫টি লাইসেন্সের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতায় রয়েছে ৩৩৫ ধরনের পণ্য।
বিএসটিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সনদ ছাড়া উৎপাদন, বাজারজাত বা বিক্রি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি লাইসেন্স থাকলেই তার সব পণ্য মানসম্মত বলে বিবেচিত হয় না। বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত প্রতিটি পণ্যের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী পৃথক মান সনদ নিতে হয়। আমদানিকৃত সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রেও নিয়ম অনুযায়ী মান যাচাই ও পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য দেশীয় বাজারে পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করা।
পণ্যের মান যাচাইয়ে নিয়মিত কারখানা ও বাজার পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে মান পরীক্ষা এবং লাইসেন্সের শর্ত প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ করে বিএসটিআই। অনিয়মের ধরন অনুযায়ী মামলা ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি পণ্য বিক্রি ও বিতরণ বন্ধ, কারখানা সিলগালা এবং লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি রোধেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওজন ও পরিমাপক যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন ও যাচাইয়ের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের পরিমাপ পরীক্ষা করা হয়েছে। পেট্রোল পাম্পের জ্বালানি সরবরাহের যন্ত্রসহ বিভিন্ন পরিমাপক যন্ত্র যাচাই করে অনিয়ম শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পণ্যের মান পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রায় ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বিএসটিআইয়ের পদার্থ ও রাসায়নিক পরীক্ষণ ল্যাবরেটরির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরীক্ষাগারের অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক পর্যায়ে পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিআলো/অর্নব