মায়ের পর এ বার মেয়ের পুজোর পালা। কোজাগরী পূর্ণিমায় ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় মাতে গোটা বাংলা। কেবল লক্ষ্মী নয়, দেবী দুর্গার আরও এক মেয়ে সরস্বতীরও পুজো হয় এই শরৎ-পূর্ণিমা তিথিতে। তাই একইসঙ্গে এক চালায় লক্ষ্মী ও সরস্বতীর পুজো হয় ঝাড়গ্রামের হাড়দা গ্রামে।
দেবীপক্ষের অন্তিম দিনে অর্থাৎ পূর্ণিমায় ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুরের হাড়দা গ্রামে লক্ষ্মী-সরস্বতীর পুজো হয়। এই পুজোর বয়স ১৬৪ বছর। একই চালায় থাকেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী, আর দুই দেবীর মাথার উপরে থাকেন নারায়ণ। এ প্রতিমা আদতে লৌকিক সংস্কৃতির দান। পুজোর উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, লক্ষ্মী এবং সরস্বতী উভয়েই নারায়ণের স্ত্রী। তাই তিন জনকে নিয়ে প্রতিমা গড়া হয়। দুই দেবীর দু’পাশে চার জন সখী থাকেন। তাঁরা ‘লুক-লুকানি’ নামে পরিচিত। কথিত, ১৮৬২ সালে হাড়দা গ্রামের অক্রুর মোড়ল স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন।
গ্রামের সাহা, মণ্ডলদের পারিবারিক পুজো আজ সর্বজনীন পুজোর আকার নিয়েছে। এখন স্থায়ী লক্ষ্মীমন্দির তৈরি হয়েছে। পূর্ণিমায় শুরু হয় পুজো, প্রতিপদের ভোরে তা শেষ হয়। কৃষ্ণ পক্ষের তৃতীয়ায় ঘট বিসর্জন হয়। ষষ্ঠীতে হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। তার পরে কাঠামো তুলে আনা হয়। একই কাঠামোয় ফি বছর প্রতিমা গড়া হয়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোকে কেন্দ্র করে পাঁচ দিনের উৎসব চলে গ্রামে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। মেলা বসে।
এখানকার মেলার প্রধান আকর্ষণ জিলিপি। দেবী লক্ষ্মীর ভোগে কিন্তু জিলিপি দেওয়ার রেওয়াজ নেই। ছোলার ডালের বেসন থেকে তৈরি বুটের নাড়ু, লুচি ও সুজি নিবেদন করা হয় নৈবেদ্য হিসাবে। তবে জিলিপি প্রসাদ হিসাবে কিনে নিয়ে যান মেলায় বেড়াতে আসা মানুষজন। জিলিপির দোকান বসানো নিয়ে নিলাম হয়। একটি মাত্র দোকান মেলায় জিলিপি বিক্রির অনুমতি পায়। নিলামে যে ব্যক্তি সর্বোচ্চ দর হাঁকেন, তিনিই জিলিপির দোকান দেওয়ার সুযোগ পান। জিলিপির দাম বেঁধে দেওয়া হয় মেলা কমিটির তরফে। পাঁচ দিনের মেলায় কয়েক হাজার কুইন্টাল জিলিপি বিক্রি হয়। আতপ চালের গুঁড়ো আর বিউলির ডালের সেই জিলিপির টানেই হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান হাড়দায়। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, এমনকি পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকেও বহু মানুষ জিলিপি চেখে দেখতে মেলায় আসেন।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
