চলতি বছর ‘মধ্যম শক্তির দেশগুলো’ শব্দটি বেশ আলোচনায় আসায় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে- কোন কোন দেশ আসলে এই দলের অন্তর্ভুক্ত? ভেবে দেখলে, প্রায় সব দেশকেই তো এই ক্যাটাগরিতে ফেলা উচিত!
গত জানুয়ারিতে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া এক বক্তব্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বর্তমান বিশ্বের বদলাতে থাকা ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। তার মতে, বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এক বড় ফাটল ধরেছে; তাই অন্যদের অর্থনৈতিক জবরদস্তি ও রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে বাঁচতে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা দরকার। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন যে এই কথার তির তার দিকে ছোঁড়া হয়েছে।
কিন্তু কথা হলো, কার্নি যাদের মধ্যম শক্তি বলেছেন, তাদের বাকি দুনিয়া থেকে আলাদা করব কীভাবে? কিংবা আদ্যে কি আলাদা করা যায়? এর উত্তর খুঁজতে হলে বরং উল্টো পথে হেঁটে বড় শক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক। একসময় ‘পরাশক্তি’ বলতে এমন সব দেশকে বোঝাতে হতো, যারা বাকি সবার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই তকমা জুটেছিল আমেরিকা আর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কপালে, আর খুব অল্প সময়ের জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও এই তালিকায় ছিল।
পরের দশকগুলোতে এই দুই পরাশক্তির মূল পরিচয় হয়ে উঠেছিল তাদের বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার- সবার হাতেই ছিল দশ হাজারেরও বেশি পারমাণবিক বোমা। মিনিট কয়েকের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সেই বোমা আছড়ে ফেলার ক্ষমতা তাদের ছিল, যা ঠেকানোর কোনো উপায় কারো ছিল না। ইচ্ছা করলেই একে অপরকে আধ ঘণ্টার মধ্যে গুঁড়িয়ে দিতে পারত তারা।
এরপর আরো কিছু দেশ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হলেও এই দুই পরাশক্তির ধারকাছে যাওয়ার মতো ক্ষমতা বা আগ্রহ কারো ছিল না। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল, আর সঙ্গে সঙ্গেই ‘পরাশক্তি’ শব্দটাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করল। আমেরিকা অবশ্য কিছুদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ছিল, যাকে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী উবের ভাদ্রিন নাম দিয়েছিলেন ‘অতিশক্তি’।
পরাশক্তির জমানা শেষ। এখন কাগজে-কলমে সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলোর হাতও নানাভাবে বাঁধা। নিজেদের সীমানা কোথায়, তা তারা টের পাক বা না পাক, দিনশেষে সেটাই সত্যি।
আজকের দিনেও আমেরিকা দারুণ শক্তিশালী, আর রাশিয়ার ভাণ্ডারে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্র। কিন্তু সমস্যা হলো, এই দুই দেশেরই শক্তির আসল সীমাটা এখন সবার চোখে আঙুল দিয়ে ধরা পড়ছে। রাশিয়া বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে ইউক্রেনের মতো ছোট একটা দেশকে কায়দায় আনতে পারল না। আর ট্রাম্প যতই আমেরিকার সামরিক বহর নিয়ে বড়াই করুন না কেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের ফল বলতে চড়া তেলের দাম আর গোলমেলে অচলাবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়।
যে দেশগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো যুদ্ধ জিতে আসতে পারে না, তাদের কি আর যাই হোক ‘পরাশক্তি’ বলা চলে? তারা কি আদৌ মহাশক্তি, নাকি দিনশেষে তারাও আর দশটা মধ্যম শক্তির দেশের মতোই সাধারণ?
কারণ যা-ই হোক না কেন, পরাশক্তির জমানা শেষ। এখন কাগজে-কলমে সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলোর হাতও নানাভাবে বাঁধা। নিজেদের সীমানা কোথায়, তা তারা টের পাক বা না পাক, দিনশেষে সেটাই সত্যি।
কিছু দেশ এখনো নিজেদের মোড়ল ভেবে ভুল করতে পারে। তাদের ধারণা, জোড়াজুড়ি করলেই সবাই বাধ্য হবে। তাদের এই অহংকার ভাঙতে হয়তো একটু সময় লাগবে। তবে মস্কো বা ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের যতই পরাক্রমশালী ভাবুন না কেন, আসল সত্য হলো- বিশ্বটা বদলে গেছে। দুনিয়ায় এখন আর কোনো পরাশক্তি নেই।
মধ্যম শক্তির দেশগুলো নানা আয়তনের হতে পারে, তবে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে তারা মোটামুটি সচেতন। ভারত, ব্রাজিল বা কানাডা- কারো পক্ষেই সামরিক জোর খাটিয়ে চারপাশের পরিবেশকে নিজেদের ইচ্ছেমতো বদলে ফেলা সম্ভব নয়। প্রভাব খাটাতে হলে তাদের ভরসা করতে হয় অর্থনৈতিক লেনদেন আর সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর। এমনকি আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় শক্তিগুলোর অবস্থানও একই।
প্রয়াত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাইয়ের শিক্ষাটা মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে জোর খাটার চেয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কাজ হাসিল করার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি চালু করেছিলেন ‘নরম শক্তি’ বা আকর্ষণের ধারণা। সামরিক শক্তি হলো ‘কঠিন শক্তি’, আর নরম শক্তি আসে সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতি, সদিচ্ছা এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের জায়গা থেকে। হয়তো এই মাপকাঠিতেই মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে চেনা যায়, অর্থাৎ যারা মূল ভরসা রাখে এই নরম শক্তির ওপরই।
অবশ্য কিছু দেশ এখনো নিজেদের মোড়ল ভেবে ভুল করতে পারে। তাদের ধারণা, জোড়াজুড়ি করলেই সবাই বাধ্য হবে। তাদের এই অহংকার ভাঙতে হয়তো একটু সময় লাগবে। তবে মস্কো বা ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের যতই পরাক্রমশালী ভাবুন না কেন, আসল সত্য হলো- বিশ্বটা বদলে গেছে। দুনিয়ায় এখন আর কোনো পরাশক্তি নেই।
লেখক: কার্ল বিল্ড হলেন সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনিরুল হক ফিরোজ
