সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার তালিকায় নাম রয়েছে সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদের। তিনি একইসঙ্গে রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়কও। আখচাষিদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি প্রণোদনার অর্থ গ্রহণের তালিকার প্রথম ১৫ জনের মধ্যে তার নাম থাকায় শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
বিজ্ঞাপন
আবু সাঈদ চাঁদের কৃষক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও আর্থিকভাবে সচ্ছল একজন জনপ্রতিনিধির প্রণোদনা গ্রহণ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে কথা উঠেছে। তবে তার দাবি, বংশপরম্পরায় তাদের পরিবার আখ চাষ ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। একজন নিবন্ধিত আখচাষি হিসেবেই তিনি এ সহায়তা নিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার বিকালে রাজশাহীর হাজী মুহাম্মদ মহসীন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আখচাষিদের মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবে সরকারি সহায়তার অর্থ পাঠানোর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
রাজশাহী অঞ্চলের ১৫টি সুগার মিল জোনের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য মোট ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অনুষ্ঠানে চেক গ্রহণকারীদের তালিকার প্রথম ১৫ জনের মধ্যে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদের নাম থাকায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে।
প্রণোদনা গ্রহণের বিষয়ে আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, সংসদ সদস্য হলেও তিনি একজন নিবন্ধিত আখচাষি। আমি একজন কৃষক। আমার বাবাও কৃষক ছিলেন। কৃষক হিসেবে অন্য চাষিদের মতো আমিও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আখচাষির প্রণোদনার চেক নিয়েছি।
চাঁদের দাবি, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাদের পরিবার আখ চাষের সঙ্গে যুক্ত। তিনি নিজেও বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন এবং রাজশাহী সুগার মিলে শত শত গাড়ি আখ সরবরাহ করেছেন। ভবিষ্যতেও আখ সরবরাহ অব্যাহত রাখবেন বলে জানান তিনি।
চাঁদ বলেন, আখ চাষ, আখ সরবরাহ ও কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা পৃথক বিষয়। সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রকৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। তার দাবি, আখ সরবরাহের বিষয়ে রাজশাহী সুগার মিল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র রয়েছে।
সচ্ছল জনপ্রতিনিধির প্রণোদনা নিয়ে প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদের আখচাষি পরিচয় নিয়ে সমর্থনমূলক বক্তব্য যেমন এসেছে, তেমনি প্রণোদনা গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদের কৃষক পরিচয়ের পক্ষে বক্তব্য যেমন এসেছে, তেমনি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তার প্রণোদনা গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
আনিকুল ইসলাম নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর মন্তব্য, চাঁদের কৃষিকাজ তার মূল পেশা—এটি সত্য হলেও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিতর্ক এড়াতে তার প্রণোদনা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।
মনিরুল ইসলাম নামের আরেক ব্যবহারকারী মনে করেন, চাঁদ কৃষক হলেও তার আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় প্রণোদনা গ্রহণের বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয়। তার মতে, ওই অর্থ কোনো দরিদ্র কৃষক পেলে বেশি উপকৃত হতে পারতেন।
অন্যদিকে ইশতিয়াক হাসান রাসেল নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী চাঁদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে লেখেন, চাঁদ যে আখ চাষ করেন, তা তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন।
পলাশ নামের আরেক ব্যবহারকারীও চাঁদের কৃষক পরিচয়ের পক্ষে মত দেন। তিনি দাবি করেন, চাঁদ কৃষক পরিবারের সন্তান এবং তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত।
যোগ্যতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন
আখচাষিদের জন্য সরকারি প্রণোদনার তালিকায় একজন সংসদ সদস্যের নাম থাকায় বিতর্কটি মূলত দুটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রথমত, তিনি প্রণোদনা পাওয়ার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছেন কি না। দ্বিতীয়ত, যোগ্যতা পূরণ করলেও একজন জনপ্রতিনিধির আর্থিক সামর্থ্য ও জনস্বার্থ বিবেচনায় এ ধরনের সহায়তা গ্রহণ করা কতটা যুক্তিসংগত।
সরকারি প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত উপকারভোগীদের যোগ্যতা, সহায়তা পাওয়ার শর্ত এবং তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা। এতে একজন জনপ্রতিনিধির প্রণোদনা গ্রহণের বিষয়টি যেমন যাচাই করা সম্ভব হবে, তেমনি প্রকৃত ক্ষুদ্র ও অসচ্ছল আখচাষিরা সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়েও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
