বিকেলের অলস সময়ে কানে হেডফোন গুঁজে প্রিয় কোনো গান শোনার অনুভূতির কথা ভাবুন তো! হঠাৎ যদি জানতে পারেন, যে সুরটা শুনে আপনার মন ভালো হয়ে গেল, যে গানের কথাগুলো আপনাকে ছুঁয়ে গেল, তার কোনোটিই কোনো মানুষ লেখেনি! পুরো গানটি বানিয়েছে একটা মেমোরি চিপ আর কিছু গাণিতিক কোড।
কথাটা শুনে কেমন একটু খটকা লাগছে, তাই না? আমরা এত দিন ধরে জেনে এসেছি, ছবি আঁকা, গল্প লেখা কিংবা সুর বাঁধার মতো কাজগুলো কেবলই মানুষের অনুভূতির প্রকাশ। কিন্তু গত কয়েক মাসে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে এমন এক বিপ্লব এসেছে, যা আমাদের এই পুরোনো ধারণাকে বড়সড় ধাক্কা দিচ্ছে। আজকের গল্পটা এআইয়ের সেই নতুন মিউজিক্যাল জাদু নিয়েই। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে জেনারেটিভ অডিও এআই।
এআইয়ের ভেতরে থাকা নিউরাল নেটওয়ার্ক এই কোটি কোটি গান বিশ্লেষণ করে দেখেছে, কোনো মেলোডি বা সুরের পর কোন নোটটা বসালে মানুষের শুনতে ভালো লাগে।
৩ মিনিটে আস্ত একটা গান!
আপনি হয়তো এর মধ্যেই টেক্সট বা ছবি তৈরির এআইয়ের কথা শুনেছেন। কিন্তু বর্তমানে সুনো কিংবা উদোর মতো সার্ভিসগুলো যা করছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য।
আপনি ল্যাপটপে শুধু লিখলেন—‘বৃষ্টির দিনের বিষণ্নতা নিয়ে একটা মেলোডিয়াস বাংলা গান বানিয়ে দাও, যেখানে অ্যাকোস্টিক গিটার আর বাঁশির সুর থাকবে।’ ব্যস, মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে এআই আপনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটা গান তৈরি করে দেবে! আর সেই গানে কেবল গিটার বা বাঁশির সুরই থাকবে না, সেখানে থাকবে চমৎকার গানের কথা, তাল এবং একজন কাল্পনিক গায়কের নিখুঁত কণ্ঠস্বর। সুরের মধ্যে কোথায় গায়ক একটু দম নেবে, কোথায় গলা একটু কাঁপবে—সবকিছুই এআই ফুটিয়ে তোলে একেবারে আসল মানুষের মতো!
হয়তো ভাবছেন, একটা যন্ত্র কীভাবে এমন অনুভূতির ছোঁয়া দিয়ে সুর সৃষ্টি করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণিত ও প্যাটার্ন চেনার ক্ষমতায়। এআই কিন্তু কোনো খাতা-কলম নিয়ে সুর বাঁধতে বসে না। একে বিশ্বের কোটি কোটি গান শুনিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এআইয়ের ভেতরে থাকা নিউরাল নেটওয়ার্ক এই কোটি কোটি গান বিশ্লেষণ করে দেখেছে, কোনো মেলোডি বা সুরের পর কোন নোটটা বসালে মানুষের শুনতে ভালো লাগে। দুঃখের গানে ড্রামসের বিট কেমন হয়, আর আনন্দঘন গানে কর্ড কীভাবে বদলায়।
অনেক তরুণ সুরকার এখন এআইকে শত্রু না ভেবে নিজের সহযোগী বানিয়ে নিচ্ছেন। মাথায় কোনো সুরের আইডিয়া এলে তাঁরা এআই দিয়ে চটজলদি তার একটা ডেমো বা খসড়া বানিয়ে নিচ্ছেন।
তবে কি মানুষের সংগীতসাধনা ফুরিয়ে যাবে
এই প্রশ্নটি এখন বিশ্বজুড়ে বড় বড় সংগীতশিল্পী আর বিজ্ঞানীদের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে—‘এআই যদি সেকেন্ডের মধ্যে গান বানিয়ে ফেলে, তবে মানুষের তৈরি সুরের কদর কি কমে যাবে?’
একটু গভীরভাবে ভাবলেই বুঝবেন, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। এআই কোটি কোটি সুরের প্যাটার্ন মিলিয়ে গান বানাতে পারে সত্য, কিন্তু তার পেছনে কোনো অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি থাকে না। একজন মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, প্রিয় মানুষকে হারায় কিংবা কোনো সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গান লেখে, সেই সুরের পেছনে থাকে একটা সত্যিকারের জীবনের গল্প। এআই অ্যালগরিদম কেবল সেই সুরের একটি বাহ্যিক রূপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের সেই সত্যিকারের অনুভূতির জন্ম দিতে পারে না।

তাই অনেক তরুণ সুরকার এখন এআইকে শত্রু না ভেবে নিজের সহযোগী বানিয়ে নিচ্ছেন। মাথায় কোনো সুরের আইডিয়া এলে তাঁরা এআই দিয়ে চটজলদি তার একটা ডেমো বা খসড়া বানিয়ে নিচ্ছেন। তারপর নিজের মেধা আর আবেগ দিয়ে সেটিকে আরও নিখুঁত করে তুলছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাজ কিন্তু কেবল জটিল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা আজ আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার ভেতরেও প্রবেশ করেছে। যন্ত্র আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে দ্রুত কাজ করা যায়, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের আসল শক্তি হলো আমরা সেই কাজে ‘প্রাণ’ দিতে পারি। এআই হয়তো হাজারটা সুর তৈরি করতে পারবে, কিন্তু কোন সুরটা আমাদের হৃদয়ে গিয়ে দোলা দেবে, সেই অনুভূতিটুকু চিরকাল মানুষ হিসেবে আমাদেরই থেকে যাবে!
