একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর নির্বাচনী প্রচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ—অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন বিএনপিপন্থী একটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন ইঞ্জিনিয়ার মো. জুয়েল খান।
তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই পটুয়াখালীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের জেলা শাখার সাংগঠনিক মতবিনিময় সভায় তাঁকে প্রধান অতিথি করায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জুয়েল খান বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বরিশাল মহানগর শাখার আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি দলটির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। সাদিক আবদুল্লাহর নির্বাচনী প্রচারে লিফলেট বিতরণ এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ছবি সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় পটুয়াখালী শহরের ব্যায়ামাগার মোড়সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের পটুয়াখালী জেলা শাখার উদ্যোগে সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জুয়েল খানকে প্রধান অতিথি করা হলে তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
সাদিক আবদুল্লাহর নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণের অভিযোগ
জুয়েল খানের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা সাদিক আবদুল্লাহর নাম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাদিক আবদুল্লাহর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জুয়েল খান। নির্বাচনী প্রচারে লিফলেট বিতরণ এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ছবিও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একসময় জুয়েল খানের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ছবি দেখা যেত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেসব ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বরিশাল মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীর কাছে ছবিগুলোর অনুলিপি রয়েছে বলে দাবি করা হলেও ছবিগুলোর মূল উৎস, প্রকাশের সময়, স্থান ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবীরের একটি ভিডিও বক্তব্যেও জুয়েল খানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। বক্তব্যটি বরিশাল মহানগর জাতীয়তাবাদী দলের একটি আলোচনা সভার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সভায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন খান স্বপনের উপস্থিতির কথাও বলা হয়েছে। তবে বক্তব্যটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কার্যালয়ে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকার অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুয়েল খানের কার্যালয়ে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টাঙানো ছিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ওই কার্যালয়ে বসা অবস্থায় তাঁর কিছু ছবিও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত এবং সাদিক আবদুল্লাহর সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব থাকার অভিযোগও উঠেছে।
তবে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বসহ এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
বিএনপিপন্থী সংগঠনে পদ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথিত ঘনিষ্ঠতা ও নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণের অভিযোগের বিপরীতে বর্তমানে বিএনপিপন্থী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে জুয়েল খানের দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ। তাঁদের প্রশ্ন, তিনি কখন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, কী প্রক্রিয়ায় তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অবগত কি না।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি থাকা কিংবা কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি একাই দলীয় আনুগত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে মূল ছবি, ভিডিও, নির্বাচনী কার্যক্রমের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ অস্বীকার জুয়েল খানের, কমিটি সম্পর্কে জানেন না বিএনপি নেতা সভাটির আয়োজক এবং পটুয়াখালী জেলা শাখার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মো. নুরুল ইসলাম প্রিন্সের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের বরিশাল মহানগর কমিটির অনুমোদন এবং কমিটি গঠনে বরিশাল মহানগর বিএনপির কারও সুপারিশ ছিল কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার মো. জুয়েল খান অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “এসব কোনো প্রশ্নের মধ্যেই পড়ে না। সাদিক আবদুল্লাহর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার ছবি বা অন্যান্য সব ছবি এআই দিয়ে করা। এ ব্যাপারে আর কিছু বলতে চাই না।”
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম সংগঠন এবং এই সংগঠনের কমিটির ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। বিএনপির সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে এটি পড়ে না। যদি কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি জাতীয়তাবাদী নামে সংগঠনের কমিটিতে থাকেন, তবে তাঁকে অবশ্যই অব্যাহতি দিতে হবে।”
জুয়েল খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যা এবং বিএনপি নেতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটির সাংগঠনিক অবস্থান, কমিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়গুলো এখন আলোচনায় রয়েছে।
The post আওয়ামী লীগ নেতা জুয়েলের ডিগবাজি, এখন বিএনপিপন্থী সংগঠনের প্রধান অতিথি appeared first on Dhaka Protidin.
